Jyoti Sarkar
আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে কয়েকজন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠে নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম। এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অনেকেই গান, বাজনা ও অভিনয়ের সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন। কিছু সদস্য নতুন ছিলেন। তারা সবাই একসঙ্গে একটি দল গড়ে গান, বাজনা ও অভিনয়ের মাধ্যমে সৃষ্টিশীল কিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন, মানুষের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলেন। তাই তাদেরই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ও সকলের প্রেরণায় গড়ে ওঠে নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম।
নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুমোদিত এবং নিবন্ধিত একটি সংস্থা। এটি নিবন্ধিত হয় ৭ই আগস্ট ২০১৯ সালে। নিবন্ধনের পর দলের প্রথম নাটক অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র তীর্থ নামক প্রেক্ষাগৃহে। নাটকের নাম ছিল "শ্রী শ্রীমা", যা শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদা দেবীর জীবনী অবলম্বনে রচিত। এই নাটক মঞ্চস্থ হয় ২০শে ডিসেম্বর ২০১৯, সন্ধ্যা বেলা। বাবার মুখে শুনেছি, সেদিন প্রচুর দর্শক এসেছিলেন, প্রেক্ষাগৃহ ছিল পূর্ণ। চারদিকে ছিল উন্মাদনার পরিবেশ। তার আগে কয়েক মাস ধরে চলেছিল মহড়া। অভিনেতাদের বেশিরভাগই নতুন ছিলেন, তাই তাদের শেখানো ও প্রস্তুত করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন নির্দেশক শ্রীমতি চন্দনা সরকার। তিনি শুধুমাত্র একজন দক্ষ নির্দেশকই নন, একজন দক্ষ অভিনেত্রীও বটে। শুধু নামভূমিকায় অভিনয় করাই নয়, তিনি কঠোর পরিশ্রম করে অভিনেতাদের চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করিয়ে তাদের উপযুক্তভাবে গড়ে তুলেছিলেন।
নাটকটি দর্শকদের অত্যন্ত ভালো লাগে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় "সুপারহিট", সেটাই হয়েছিল এই নাটকের ভাগ্য।
এরপর নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম একে একে অনেক নাটক মঞ্চস্থ করে। এ ছাড়াও বিভিন্ন উপলক্ষে নাচ, গান, ছোট নাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। এর মাধ্যমে দলের সদস্যরা নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন এবং সাংস্কৃতিক তৃষ্ণা মিটিয়েছেন, পাশাপাশি দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন।
এদের মঞ্চস্থ করা নাটকগুলোর নাম না বললে এই প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। "তোতারাম", "বড় পিসিমা", "দান প্রতিদান"—এই নাটকগুলো অনুষ্ঠিত হয় সল্টলেকের রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবনে। ২০২১ সালে রথীন্দ্রমঞ্চে আয়োজিত একটি নাট্য প্রতিযোগিতায় নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম অংশগ্রহণ করে এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন দলের দীর্ঘদিনের সদস্যা নীলাঞ্জনা মুখোপাধ্যায়।
এছাড়াও, ছোট মঞ্চে বিভিন্ন ছোট নাটক অনুষ্ঠিত হয়েছে, ছোট ফিল্ম তৈরি হয়েছে, এবং সব অনুষ্ঠানই প্রশংসিত হয়েছে।
আমি এই দলে যোগদান করি ২০২১ সালে। চন্দনাদির কাছে অভিনয়কলা শিখছি, যা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত থাকার আনন্দই আলাদা। দৈনন্দিন জীবনের গতানুগতিকতার মাঝে এটি যেন এক স্বস্তির পরশ। নিজেকে নতুন করে উপলব্ধি করার এক অন্যরকম অনুভূতি!
নির্দেশকের মতামত নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম সম্পর্কে
— শ্রীমতি চন্দনা সরকার
নির্দেশক, নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম
নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম শুধু একটি নাট্যদল নয়, এটি একটি পরিবার। এই দলের প্রত্যেক সদস্য একসঙ্গে স্বপ্ন দেখে, একসঙ্গে শেখে, এবং একসঙ্গে সৃষ্টিশীল কাজ করে। আমি যখন প্রথমবার এই দলের সঙ্গে যুক্ত হই, তখনই বুঝতে পারি, এরা সত্যিকারের ভালোবেসে নাটক করে। এখানকার সবাই অভিনয়ের প্রতি আন্তরিক এবং নিজেদের ক্রমাগত উন্নত করার জন্য সবসময় চেষ্টা করে।
আমি অভিনয়ে পেশাদারভাবে যুক্ত হয়েছিলাম। অনেক জায়গায় ওয়ার্কশপ করেছি, শিখেছি, নিজে গ্রুপ থিয়েটার করেছি। ধীরে ধীরে অভিনয়ই আমার পেশা হয়ে যায়। আমি বহু টেলিভিশন সিরিয়ালে অভিনয় করেছি, তবে মূলত থিয়েটার—স্টেজ—ছিল আমার টান, আমার ভালোবাসার জায়গা।
চিন্তাশীল – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুরু থেকেই থিয়েটারের প্রতি আমার গভীর আকর্ষণ ছিল। আমি বাচ্চাদের এবং বড়দের নিয়ে থিয়েটার শুরু করি। এরপর ধীরে ধীরে ভাবতে লাগলাম, এবার নিজের একটি নাট্যদল তৈরি করব। সেই ভাবনা থেকেই নিউটাউনের নাম অনুসারে আমাদের দলের নাম হয় নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম।
আমাদের একাধিক প্রোডাকশন হয়েছে, তবে "রাজদর্শন" আমার ৩১তম প্রোডাকশন। আমি ২০১২ সাল থেকে থিয়েটারে কাজ করছি। দলটিকে রেজিস্টার করার পর "মা সারদা", "দান প্রতিদান", "তোতারাম"-এর মতো বিভিন্ন নাটক মঞ্চস্থ হতে থাকে। আমরা অনেক সাফল্য অর্জন করেছি, সম্মান পেয়েছি, এবং দর্শকদের কাছ থেকে অসংখ্য ভালো মন্তব্য পেয়েছি।
এই প্রশংসা, সম্মান, এবং দর্শকদের ভালোবাসা—এগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও শ্রেষ্ঠ উপহার।
প্রথম নাটক "শ্রী শ্রীমা" মঞ্চস্থ করার সময় নতুনদের নিয়ে কাজ করা সহজ ছিল না, তবে তাদের আগ্রহ, পরিশ্রম, এবং শেখার ইচ্ছা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তারা প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা দর্শকদের হৃদয়ে গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল। সেই নাটকের সাফল্যের পর একের পর এক প্রযোজনায় এই দল নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ হয় তখন, যখন দেখি একজন নতুন সদস্য এখানে এসে অভিনয় শেখে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করে, এবং সময়ের সাথে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ অভিনেতা বা অভিনেত্রী হিসেবে গড়ে তোলে। এটাই আমাদের দলের আসল সাফল্য। শুধুমাত্র নাটক মঞ্চস্থ করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং একজন শিল্পীকে গড়ে তোলা, একজন মানুষকে তার সৃজনশীল দিক আবিষ্কার করতে সাহায্য করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
নিউ টাউন নাট্য বিহঙ্গম আজ যে জায়গায় পৌঁছেছে, তা একদিনে হয়নি। এটি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। ভবিষ্যতে আমরা আরও ভালো কাজ করব, আরও নতুন নাটক আনব, এবং বাংলা নাট্যজগতের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখব—এই আমার আশা ও প্রত্যাশা।
লেখার সৌজন্যে: জ্যোতি সরকার






No comments:
Post a Comment