Showing posts with label Buddhadeb Gorai. Show all posts
Showing posts with label Buddhadeb Gorai. Show all posts

An Undisputed Journalist: Aruna Asaf Ali

এক অবিসংবাদিত সাংবাদিক:- অরুণা আসফ আলী

Guest Column

Buddhadeb Gorai

Source: Online
Aruna Asaf Ali (née Ganguly) (16 July 1909 – 29 July 1996) was an Indian educator, political activist, and publisher. An active participant in the Indian independence movement, she is widely remembered for hoisting the Indian National flag at the Gowalia Tank maidan, Bombay during the Quit India Movement in 1942. Post-independence, she remained active in politics, becoming Delhi's first Mayor.

আজ ২৯ জুলাই—ভারতীয় ইতিহাসের এক অনন্য নারী, এক দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, নির্ভীক সমাজচিন্তক ও সাংবাদিকতার জ্যোতির্ময় প্রতীক অরুণা আসফ আলীর মৃত্যুদিন । তিনি শুধু ইতিহাসের পাতায় একটি নাম নন, তিনি ছিলেন বিপ্লবের কণ্ঠস্বর, চিন্তার শক্তি এবং সত্যের অবিচল আশ্রয়। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং নারীর নীরবতা ভাঙার বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিবাদ।

১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে তিনি যখন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন—তখন তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত সাহসই ভারতীয় নারীর আত্মজাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। আবার স্বাধীনতার পর তিনি সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করে দেখিয়ে দিলেন—কলমও হতে পারে এক বিপ্লবী অস্ত্র।

 সংক্ষিপ্ত জীবনী

অরুণা আসফ আলী (১৬ জুলাই, ১৯০৯ – ২৯ জুলাই, ১৯৯৬) ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেত্রী, সাংবাদিক, শিক্ষিকা ও সমাজতন্ত্রী চিন্তাবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল অরুণা গাঙ্গুলী। তিনি পাঞ্জাবের কালকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। লাহোরের সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট ও নৈনিতালের অল সেন্টস কলেজ থেকে শিক্ষালাভ করেন এবং পরে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯২৮ সালে কংগ্রেস নেতা আসফ আলীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যা ছিল সেই সময়ের প্রথাগত সমাজের বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ। তিনি ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেন এবং তিহার জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের অবস্থার বিরুদ্ধে অনশন করেন।

১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (Quit India Movement) তিনি গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে দেশজুড়ে বিক্ষোভের অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে সমাজতান্ত্রিক ও বাম রাজনীতির ধারায় যুক্ত হন।

তিনি ছিলেন দিল্লির প্রথম মহিলা মেয়র (১৯৫৮) এবং প্রতিষ্ঠা করেন দুইটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র—The Patriot ও Link।

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন:

পদ্মবিভূষণ (১৯৯২)

ভারতরত্ন (মরণোত্তর, ১৯৯৭)

লেনিন শান্তি পুরস্কার (১৯৬৪)

 সাংবাদিকতায় অরুণা আসফ আলীর ভূমিকা

অরুণা আসফ আলীর সাংবাদিকতা ছিল চেতনা ও ন্যায়ের সংগ্রাম। সংবাদপত্র তাঁর কাছে ছিল অস্ত্র ও প্রতিরোধের ভাষা। ১৯৪৭-এর পরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যখন রাষ্ট্রীয় ও কর্পোরেট প্রভাবের মুখোমুখি, তখন তিনি সংবাদপত্রকে করেছিলেন বিকল্প রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘Patriot’ ও ‘Link’ কেবল কংগ্রেসপন্থী মুখপত্র ছিল না, বরং শ্রমিক, কৃষক, নারীর অধিকার ও আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধ ছিল।

তিনি কখনো দলীয় চাপে মাথা নত করেননি, বরং সত্য ও মানবিক নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

 তাঁর সাংবাদিকতার চারটি মূল বৈশিষ্ট্য

১. বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ –

অরুণা আসফ আলীর সাংবাদিকতা কখনোই জল্পনা-কল্পনার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল না। তিনি প্রতিটি তথ্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে, তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর লেখায় ছিল যুক্তির নির্মোহ শাণ ও সত্যান্বেষণের স্পষ্টতা।

২. নৈতিক সাহস –

তিনি ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি কখনো প্রভাবশালী শক্তির সামনে মাথা নত করেননি। রাষ্ট্রের অন্যায় নীতি কিংবা দলের ভুল সিদ্ধান্ত— সব কিছুর বিরুদ্ধেই তিনি কলম ধরেছেন। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল বিবেক ও ন্যায়ের প্রতি অটল অঙ্গীকার।

৩. জনমত গঠনের কুশলতা –

শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন পাঠকের চিন্তাকে উদ্বুদ্ধ করাই সাংবাদিকতার প্রধান দায়িত্ব। অবহেলিত, প্রান্তিক, নির্যাতিত মানুষের কথা তুলে ধরে তিনি সমাজে সচেতনতা গড়ে তুলতেন এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতেন।

৪. নারী নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা –

একজন নারী হিসেবে তিনি সাংবাদিকতার যে মঞ্চ তৈরি করেছিলেন, তা ছিল নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নেতৃত্বের এক দীপ্ত প্রতীক। অরুণা আসফ আলী নারীর কণ্ঠকে মূলস্রোতের সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠা দিয়ে যান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক সাহসী দিশা রেখে।

নারী ও সাংবাদিকতা: চিন্তার স্বাধীনতায় প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর

অরুণা আসফ আলী বিশ্বাস করতেন—

 “নারীর মুক্তি কেবল ভোটাধিকার নয়, তা চিন্তার স্বাধিকার, ভাষার অধিকার ও প্রতিবাদের সাহসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।” তাঁর মতে, সংবাদপত্র কেবল তথ্যের বাহক নয়, বরং তা হতে পারে এক বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা, যেখানে নারীর নিজের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। তিনি নারীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন কলমকে করে তুলতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অস্ত্র। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল শুধুই তথ্য পরিবেশন নয়, বরং নারীজগৎ থেকে উৎসারিত সত্য, অনুভব ও প্রতিবাদের সুনির্দিষ্ট রূপ। এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই তিনি নারীর সাংবাদিকতা চর্চাকে শুধু অনুপ্রেরণামূলক নয়, চিন্তার মুক্তির বিপ্লবে পরিণত করেছিলেন।

উপসংহার

অরুণা আসফ আলী ছিলেন কেবল একজন সাহসিনী স্বাধীনতা সংগ্রামী নন—তিনি ছিলেন ভারতীয় সাংবাদিকতার এক চিরজাগরূক বিবেক। তাঁর কলম ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক প্রখর প্রতিবাদ, এবং তাঁর সাংবাদিকতা ছিল ন্যায়ের পক্ষে এক নিরলস অঙ্গীকার। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—সাংবাদিকতা শুধুমাত্র খবরের ভাষ্য নয়, তা এক নৈতিক চেতনার প্রতিচ্ছবি, যেখানে তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় দায়বদ্ধতা, এবং মতামতের সঙ্গে যুক্ত হয় মনুষ্যত্ব। আজকের তথাকথিত "বাজারমুখী" ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সংবাদ পরিবেশে, অরুণা আসফ আলীর জীবন ও কর্ম যেন এক দীপ্ত মাইলফলক। তাঁর আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি সত্য বলার সাহসে নিহিত।” সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড—এবং অরুণা আসফ আলী ছিলেন সেই মেরুদণ্ডের এক অবিচল স্তম্ভ। এই কারণেই ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করে কেবল একজন বিপ্লবী নারীনেত্রী হিসেবে নয়, বরং—“এক অবিসংবাদিত সাংবাদিক: অরুণা আসফ আলী”—এই শ্রদ্ধার্ঘ্যে অমর হয়ে আছেন তিনি।

------


গুরু পূর্ণিমা: এক প্রজ্ঞার উৎসব

 - Celebration of Guru Purnima -

Guest Column

 Buddhadeb Gorai

Assistant Professor

Deshbandhu College for Girls

Pexels

ভূমিকা

“গুরুব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”

ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ‘গুরু’ শব্দটি কেবল শিক্ষক বা জ্ঞানদাতার পরিচয় নয়; বরং তিনি সেই আলোকিত সত্তা, যিনি অজ্ঞতার ঘনঘোরে জ্বালিয়ে দেন চেতনার দীপ্ত শিখা। বাহ্যজ্ঞান নয়, তিনি অন্তর্জ্ঞানের দিশারি—আত্ম-উন্মোচনের কর্ণধার। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত ‘গুরু পূর্ণিমা’ এটি গুরু-শিষ্য সম্পর্কের চিরন্তন চেতনার এক প্রজ্জ্বলিত অনুরণন, যেখানে প্রণতি রূপ নেয় প্রজ্ঞার দ্বাররক্ষী, আর শ্রদ্ধা হয়ে ওঠে আত্মসন্ধানের একাগ্র সংকল্প।

এই পবিত্র দিনটি শুধুই আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর নয়, বরং এটি এক আত্মশুদ্ধির ব্রত, এক অন্তর্জাগরণের তপস্যা। এর উৎস নিহিত রয়েছে ঋগ্বেদ, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা, যোগশাস্ত্র, তন্ত্র ও স্মৃতিগ্রন্থসমূহের অন্তঃস্থলে—যেখানে গুরু হয়ে ওঠেন মানবিক সম্ভাবনার সর্বোচ্চ প্রকাশ।

‘গুরু’ কে?

‘গুরু’ শব্দটি কেবল একটি সম্বোধন নয়—এটি এক বহুরূপী জীবনদর্শনের প্রতীক। সংস্কৃত ব্যুৎপত্তিতে—

“গুঃ অন্ধকারং, রুঃ নাশকঃ।
গুরুঃ অন্ধকারনাশকঃ।”

— স্কন্দ পুরাণ

অর্থাৎ ‘গু’ মানে অন্ধকার, ‘রু’ মানে সেই শক্তি যা অন্ধকার বিনাশ করে। গুরু সেই ব্যক্তি যিনি অবিদ্যার অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের দীপ্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে গুরুতত্ত্ব কেবল ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। গুরু হলেন সেই সত্তা, যিনি নিজের আত্মপ্রকাশকে শিষ্যের অন্তরলোকে জাগিয়ে দেন। তিনি নিঃস্বার্থ, আত্মজ্ঞ, আলোকসম্পন্ন; নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যকে জ্ঞানের দীপ্তিময় পথে চালিত করেন।

মুন্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে—
“তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেত্
সমিত্পাণিঃ শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্।”

(মুন্ডক উপনিষদ ১.২.১২)

অর্থাৎ আত্মতত্ত্ব বা ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য সেই শিষ্যকে গুরুর শরণ নিতে হবে, যিনি শ্রোত্রিয় (শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন) ও ব্রহ্মনিষ্ঠ (আত্মসন্ধানে স্থিত)।

এই গুরু কেবল তথ্যদাতা নন, তিনি শিষ্যের চেতনার গভীরে জ্ঞানের দীপ জ্বালিয়ে দেন। তাই গুরু হচ্ছেন—
 
• জ্ঞানের বাহক,
 
• তত্ত্বের রক্ষক,
 
• চেতনার জাগরণকারী।

তিনি শিষ্যকে আলোর পথে, অমৃতের পথে—‘অসতো মা সদ্ গময়’—নিয়ে যান।

ব্যাসদেব ও গুরু পূর্ণিমার ঐতিহাসিক শিকড়

গুরু পূর্ণিমার প্রাচীন রূপ 'ব্যাস পূর্ণিমা'— যা ভারতীয় জ্ঞানধারা ও সাহিত্যের অন্তঃস্থ কেন্দ্রে রচিত এক শ্রদ্ধার প্রস্তাবনা। এই দিনে আমরা স্মরণ করি সেই অসাধারণ ঋষিকে—মহর্ষি বেদব্যাস—যিনি জ্ঞানকে কেবল ধারণ করেননি, বরং তাকে সংহত করে লোকজ উপলব্ধির উপযোগী করে তুলেছেন।

বেদব্যাস—কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন—ছিলেন পরাশর ঋষি ও সত্যবতীর পুত্র।
তাঁর কীর্তিসমূহঃ
• চার বেদের সংকলন,
• ব্রহ্মসূত্র রচনা,
• মহাভারতের মহাকাব্য সৃজন,
• ঊনিশটি পুরাণ ও উপপুরাণের সংকলন।

এই আষাঢ়ী পূর্ণিমাতেই তাঁর জন্ম হয়েছিল বলে শাস্ত্রমতে বিশ্বাস। সেই কারণে শিষ্যসমাজ এ দিন ব্যাসদেবকে গুরুপরম্পরার আদিগুরু হিসেবে পূজা করে। সময়ের সঙ্গে ব্যাস পূর্ণিমা রূপান্তরিত হয় গুরু পূর্ণিমায়—যেখানে ব্যাসদেব হয়ে ওঠেন সমস্ত গুরু-তত্ত্বের উৎসস্থল।

গুরু-শিষ্য সম্পর্কের গূঢ়তা

ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্ক কেবল জ্ঞান-বিনিময়ের নয়—এটি আত্মা ও চৈতন্যের এক দীক্ষিত সংলাপ।

এই সম্পর্ক তিনটি স্তম্ভে স্থাপিত—
• প্রণিপাত (বিনম্র আত্মসমর্পণ),
• পরিপ্রশ্ন (সতত অন্বেষা),
• সেবা (নির্বিচার নিষ্ঠা)।

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় (৪.৩৪) বলা হয়েছে—
“তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদীক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ॥”

অর্থাৎ, সত্যদ্রষ্টা গুরুর নিকট যেতে হবে প্রণতিসহকারে, শ্রদ্ধাসহকারে প্রশ্ন করে, সেবার মাধ্যমে নিবেদন জানিয়ে—তাহলেই তিনি তত্ত্বজ্ঞান দান করবেন।

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ভাষায়—
“যস্য দেৱে পরা ভক্তিঃ তথা দেৱে তথা গুরৌ।
তস্যৈতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ॥”

— শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬.২৩

অর্থাৎ, যাঁর ঈশ্বর ও গুরুর প্রতি সমান ভক্তি রয়েছে, তিনিই প্রকৃত শাস্ত্রজ্ঞানের অধিকারী।

এই শ্লোকগুলি গুরু-শিষ্য সম্পর্কের দার্শনিক গভীরতা উন্মোচন করে—গুরু কেবল শিক্ষক নন, ঈশ্বরপ্রতিম তত্ত্বদ্রষ্টা, যাঁর কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ মানে আত্মদীক্ষা ও চেতনার বিবর্তন।

গুরুকুল থেকে শাস্ত্রীয় গুরুতত্ত্ব

ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা—গুরুকুল—ছিল কেবল বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্র নয়; এটি ছিল আত্মশিক্ষার এক অভিন্ন, ধ্যানমগ্ন ক্ষেত্র, যেখানে শিক্ষা মানে ছিল চরিত্রগঠন, আত্মশাসন ও চেতনার প্রসার। এখানে শিক্ষা ছিল সহাবস্থানমূলক—গুরুর সান্নিধ্যে, তাঁর প্রতিদিনের জীবনের মধ্য দিয়ে, ধ্যান-সেবা-সংযমের ধারায়।

এই ধারায় গুরু কেবল জ্ঞানদাতা নন, তিনি ছিলেন আত্মিক জীবনের আদর্শ, দেহ ও মনের সাধনার পথপ্রদর্শক। উপনিষদের ভাষায়—
“আচার্যবান্ পুরুষো বেদ।”
— ছান্দোগ্য উপনিষদ (৬.১৪.২)

অর্থাৎ, যাঁর জীবনে আচার্য বা গুরু আছেন, তিনিই প্রকৃতভাবে জ্ঞান উপলব্ধি করতে সক্ষম।

শিব-পার্বতীর সংলাপে সংকলিত স্কন্দ পুরাণের ‘শ্রীগুরু গীতা’-য় গুরুতত্ত্বকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক সর্বব্যাপী, ঐশ্বরিক মহাশক্তি হিসেবে—
“গুরুর্ ব্রহ্মা গুরুর্ বিষ্ণুঃ গুরুর্ দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”

এটি কেবল এক স্তোত্র নয়—গুরুর আত্মিক অবস্থানের স্বীকৃতি। গুরু কেবল জ্ঞান জানেন না—তিনি নিজেই জ্ঞানতত্ত্বরূপ।

গুরুকুল প্রথায় এই গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ছিল একেবারে ঘনিষ্ঠ ও সহজ। শিষ্য কেবল পাঠ্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, গুরুর আচরণে, বাক্যে, নীরবতায় শিক্ষালাভ করত। এই শিক্ষা ছিল অ-পরীক্ষানির্ভর, অ-পাঠ্যসূচিবদ্ধ; এটি ছিল এক অন্তর্জ্ঞানময়, ব্যতিক্রমী জীবনযাত্রার সাধনা।

যোগ-তন্ত্রে গুরু

যোগ ও তন্ত্র—এই দুই সাধনাপথে গুরু হয়ে ওঠেন কেবল নির্দেশক নন, তিনি নিজেই সেই চেতনার উৎস, যার থেকে আত্মোদ্ভব ঘটে।

যোগসূত্রে পতঞ্জলি বলেন—
“স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেনানবচ্ছেদাৎ॥”
— যোগসূত্র ১.২৬

অর্থাৎ, ঈশ্বরই আদিগুরু, যিনি কালের সীমা ছাড়িয়ে চিরন্তনভাবে সমস্ত ঋষি ও যোগীর হৃদয়ে চৈতন্যরূপে বর্তমান। এই ঈশ্বর-গুরু—নিঃশব্দ, কিন্তু সর্বত্র গূঢ়, অন্তর্জ্ঞানে দীপ্ত।

তন্ত্রশাস্ত্রে গুরু হলেন মন্ত্রদাতা, দীক্ষাগুরু, শক্তিপ্রবর্তক। তিনি কেবল তত্ত্ব শেখান না; বরং কুণ্ডলিনী জাগরণের মধ্য দিয়ে শিষ্যের আত্মবোধ ও রূপান্তরের সূচনা করেন।

“গুরুং বিনা ন সিদ্ধিঃ স্যাৎ সর্বত্র নাত্র সংশয়ঃ॥”
— তন্ত্রসার

অর্থাৎ, গুরুর অনুগ্রহ ব্যতীত আধ্যাত্মিক সিদ্ধি সম্ভব নয়। কারণ তন্ত্রে জ্ঞান হল চৈতন্য-প্রবাহ—যা কেবল দীক্ষার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।

শ্রীগুরু গীতায় বলা হয়—
“ন গুরুঃ ন পিতা মাতা, ন বন্ধুঃ ন পতিস্তথা।
যঃ সত্যং ব্ৰুহতি প্রীত্যা, স গুরুঃ সত্যদর্শিনঃ॥”

— শ্রীগুরু গীতা

অর্থাৎ, যিনি হৃদয় থেকে সত্য উপলব্ধি করেন এবং তা স্নেহসহকারে প্রকাশ করেন—তিনিই প্রকৃত সত্যদর্শী গুরু, পিতা, মাতা, বন্ধু বা পতিও সেই গুরুতুল্য নন।

যোগ ও তন্ত্র উভয় ধারায় গুরু দীক্ষাদাতা, চেতনা-উন্মোচক এবং মোক্ষের সহযাত্রী। তিনি কেবল দিগ্দর্শক নন—তিনি নিজেই পথ, তিনি নিজেই গন্তব্য।

গুরু পূর্ণিমার আচরণ ও প্রথা: বাহ্য আচার থেকে অন্তর্নিহিত আত্মশুদ্ধি

গুরু পূর্ণিমা কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস নয়—এটি এক নিঃশব্দ আত্মনিবেদনের মুহূর্ত, যেখানে বাহ্যিক প্রণতি রূপ নেয় অন্তরের আত্মসমর্পণে।

এই দিনে ফল, পুষ্প, দীক্ষাদক্ষিণা ইত্যাদি উপাচার কেবল উপহার নয়—এগুলি অন্তরের কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

গুরুস্তোত্র পাঠ, গুরুপরম্পরার শ্রবণ, ও গুরু-চরণে ধ্যান—এই সবকিছু শিষ্যকে স্মরণ করায়, তিনি কার আশ্রয়ে চলেছেন, এবং তাঁর চৈতন্য কোথায় নিবদ্ধ।

“নাভিবাদয়েত্ গুরুং, ন নমন্তি সদা গুরুং।
যত্র কুত্র ন তিষ্ঠন্তি, গুরুঃ সর্বত্র সর্বদা॥”

— স্মৃতিশাস্ত্র

অর্থাৎ, গুরু কেবল বাহ্যিক সত্তা নন—তিনি সর্বত্র, চেতনার প্রতিটি স্তরে, চিরকাল বর্তমান।

এই উপলব্ধিই গুরু পূর্ণিমার অন্তর্নিহিত সাধনা—যেখানে প্রণতি মানে আত্মদীক্ষা, আর বাহ্য আচরণ রূপ নেয় চৈতন্যানুশীলনে।

এই দিনটি হয়ে ওঠে—
• আত্মস্মরণের নিঃশব্দ প্রহর,
• শিষ্যত্বের গভীর প্রতিজ্ঞা,
• এবং গুরুতত্ত্বের অন্তর্জ্যোতির আবাহন।

উপসংহার

গুরু পূর্ণিমা নিছক কোনও পূজা বা আচারানুষ্ঠান নয়—এটি এক আত্মদীক্ষার উজ্জ্বল প্রহর, আত্মসংশোধনের এক নিরব তপস্যা, যার অন্তরালে জ্বলজ্বল করে চৈতন্যের অনন্ত দীপশিখা।

অর্থাৎ, এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—গুরু হলেন সেই,
“যিনি আমাদের কী ভাবতে হবে তা শেখান না, বরং কীভাবে ভাবতে হয়, তা জাগিয়ে তোলেন।”
তাঁর আশ্রয়ে জ্ঞান হয়ে ওঠে অন্তর্জ্ঞান, শিক্ষা রূপ নেয় সাধনায়, আর প্রণতি পরিণত হয় অন্তরের নিবেদনে।

গুরুস্তোত্রে বলা হয়েছে—
“অজ্ঞানতমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”

অর্থাৎ, “যিনি জ্ঞানের অঞ্জন দ্বারা অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে নয়ন খুলে দেন—তাঁকে আমি প্রণাম করি।”

এই এক পংক্তিতে গুরুতত্ত্বের সারমর্ম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গুরু হলেন সেই—
• যিনি অন্ধতার ঘন অরণ্যে জ্বালিয়ে দেন চেতনার দীপ,
• যিনি প্রজ্ঞার অঞ্জনে খুলে দেন অন্তর্দৃষ্টি,
• যিনি শিষ্যের বুকে জাগিয়ে তোলেন আত্মসন্ধানের পবিত্র আকাঙ্ক্ষা।

গুরু পূর্ণিমা তাই শুধুই একটি উৎসব নয়—এটি চেতনার দীপ্ত জাগরণ। এই দিনে আমরা প্রণতি জানাই এমন এক পথপ্রদর্শককে, যিনি কেবল বাহিরের আলোক নন—তিনি হৃদয়ের অন্তরতম স্থানে জ্বলে থাকা এক শাশ্বত প্রদীপ।

আজকের দিনে, আসুন আমরা কেবল গুরুর চরণে নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে, জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে স্থাপন করি সেই গুরুতত্ত্বকে—

• যিনি সময়ের স্রোতে চেতনার পাথেয়,
• যিনি প্রজ্ঞার আলোক,
• যিনি আত্মজ্ঞানের মৌন মূর্তী
• যিনি আমাদের চালনা করেন সত্যের দিকে।

 

---------

 

আজ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস

Guest Column

(International Day of Cooperatives)

by

Buddhadeb Gorai

Assistant Professor in Philosophy, Deshbandhu College for Girls, Calcutta University

Pexels

ভূমিকা

"সহযোগেই মানুষের মুক্তি, প্রতিযোগে নয়।"— মহামানব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৫ জুলাই (শনিবার) ২০২৫—একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যেদিন বিশ্বমঞ্চে উদ্‌যাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস (International Day of Cooperatives)। এ দিনটি যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজ বিনির্মাণের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে একক প্রয়াসের নয়, বরং সমবেত উদ্যোগের মধ্যে।

যেখানে প্রতিযোগিতার দৌড়ে মানুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, সেখানে সমবায় চেতনা মানুষকে করে তোলে পরস্পরের সহযাত্রী। ব্যক্তি-নির্ভর পুঁজিবাদী উন্নয়নের জোয়ারে যখন সমাজ প্লাবিত, তখন এই দিবস এক বিকল্প আলোকবর্তিকা নিয়ে আসে—যেখানে সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব এবং সমানাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এক সহমর্মী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের রূপরেখা।এই দিনটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়—এ যেন এক মূল্যবোধের অনুশীলন, এক সামাজিক ও নৈতিক আহ্বান:--“তুমি একা নও, একসাথে পথ হোক উত্তরণের।”

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস তাই আমাদের কাছে কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ—যা উন্নয়নকে অর্থের বিচারে নয়, মানবিকতা ও সংহতির পরিমাপে বিচার করে।

দিবসটির সূচনা ও স্বীকৃতি

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের শিকড় নিহিত রয়েছে উনিশ শতকের সমাজ পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। ১৮৪৪ সালে, ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার অঞ্চলের রোচডেল শহরে একদল বুননশিল্পী শ্রমিক গড়ে তোলেন “Rochdale Society of Equitable Pioneers” নামক একটি সমবায় সংস্থা। এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যে পরিচালিত প্রথম আধুনিক ও সংগঠিত সমবায় উদ্যোগ। এই সংস্থাই “Rochdale Principles” নামে পরিচিত সমবায়ের সাতটি মৌলিক নীতি রূপ দেয়, যা আজও বিশ্বের সমবায় কাঠামোর ভিত্তি।

এরপর সময়ের পরিক্রমায়, ১৮৯৫ সালে গঠিত হয় International Co-operative Alliance (ICA)—যা বিশ্বব্যাপী সমবায় আন্দোলনের ছাতাসংগঠন। ICA ১৯২৩ সাল থেকে প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস পালন শুরু করে, যাতে বিশ্ববাসী সমবায়ের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারে।

১৯৯২ সালে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ICA-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালে—যা ছিল ICA-এর শতবর্ষপূর্তি বছর—থেকে দিবসটি জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসটি জাতিসংঘের “সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (SDGs)” এর সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত, বিশেষত দারিদ্র্য দূরীকরণ, লিঙ্গ-সমতা, ন্যায্য কর্মসংস্থান ও সুস্থায়ী সম্প্রদায় গঠনের লক্ষ্যে।আজ এই দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মারক নয়, বরং বিশ্বব্যাপী এক নৈতিক ও সামাজিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ—যেখানে ব্যক্তির থেকে গোষ্ঠী, প্রতিযোগিতার থেকে সহযোগ, এবং লাভের থেকে দায়িত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

 ২০২৫ সালের থিম--"Cooperatives: Building a Better Future for All"

 বাংলা অর্থ: “সমবায়: সবার জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক”

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের এই বার্তাটি নিছক একটি স্লোগান নয়; এটি এক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান, যা বর্তমান বৈষম্যপূর্ণ, সংকটপূর্ণ এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকটের প্রেক্ষিতে সমবায়ের ভূমিকাকে নতুন আলোয় তুলে ধরে।

এই থিমটি মূলত তিনটি মৌলিক বোধকে কেন্দ্রীভূত করে:

1. অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন (Inclusive Development):

যেখানে সবাই—নারী, শিশু, শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। সমবায় কাঠামো এই অন্তর্ভুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

2. মানবিক অর্থনীতি (Human-centered Economy):

সমবায়ের দর্শন লাভ নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন ও সম্মানকে প্রাধান্য দেয়। তাই এটি একটি "মানুষ-কেন্দ্রিক" বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরি করে, যা ব্যক্তিস্বার্থের উপরে গোষ্ঠীর মঙ্গলকে স্থান দেয়।

3. সুস্থায়ী ভবিষ্যৎ নির্মাণ (Sustainable Future):

জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতা—এই সংকটগুলো মোকাবিলায় সমবায় একটি ন্যায্য ও সহনশীল কাঠামো প্রদান করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান রক্ষায় সহায়ক।

এই থিমের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—সমবায় শুধু উৎপাদনের একটি ব্যবস্থা নয়, এটি সমাজ বিনির্মাণের এক নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি।এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে জিজ্ঞাসা তোলে—“উন্নয়ন কার জন্য? উন্নয়ন কাদের সঙ্গে নিয়ে?”

আন্তর্জাতিক সমবায় সংঘ (ICA) এই থিমের আওতায় ২০২৫ সালে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে—

 1. নারীদের নেতৃত্বে সমবায়

 2. যুবসমাজের অংশগ্রহণ

 3. ডিজিটাল ও সবুজ সমবায় উদ্যোগ

 4. স্থানীয় সম্পদের উপর ভিত্তি করে সুস্থায়ী কর্মসংস্থান

এইভাবে, ২০২৫ সালের থিমটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—সহযোগ, সমতা ও সংহতির ভিত্তিতে গড়ে উঠুক এমন এক বিশ্ব, যেখানে উন্নয়ন কারো একার সম্পদ নয়—বরং সবার অধিকার।

সমবায়ের মৌলিক নীতি: “Rochdale Principles”

১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রোচডেল শহরে গঠিত “Rochdale Society of Equitable Pioneers” আধুনিক সমবায় আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। এই সংগঠনটি সমবায় পরিচালনার জন্য যে সাতটি নৈতিক ও কার্যকর নীতি নির্ধারণ করেছিল, তা পরবর্তীতে “Rochdale Principles” নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়।

এই সাতটি নীতি শুধু ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম নয়, বরং একটি মানবিক ও ন্যায্য সমাজ গঠনের রূপরেখা:

1. গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ (Democratic Member Control):

সমবায়ে প্রত্যেক সদস্যের সমান অধিকার থাকে। “এক সদস্য, এক ভোট” নীতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়—চাই সে যত বড় বিনিয়োগকারী হোক বা ছোট। এটি সমবায়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিশ্চিত করে।

2. অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (Member Economic Participation):

সদস্যরা সমবায়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেন এবং লাভের ন্যায্য অংশ পান। লাভের বিতরণ করা হয় সদস্যদের ব্যবহারের পরিমাণ অনুসারে, কেবল মূলধনের অনুপাতে নয়—এটাই মূল পার্থক্য পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

3. স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা (Autonomy and Independence):

সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের সদস্যদের দ্বারা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। কোনো সরকারি বা বেসরকারি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের স্বার্থে কাজ করে।

4. শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্য (Education, Training and Information):

সদস্যদের সচেতন ও সক্ষম করে তুলতে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে সমবায়ের চেতনা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জানানো হয়।

5. পরস্পর সহযোগিতা (Cooperation among Cooperatives):

সমবায় সংস্থাগুলি পরস্পরের সঙ্গে ন্যায্য ও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় যুক্ত থাকে—স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। এতে একটি বৃহত্তর সমবায় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

6. সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব (Concern for Community):

সমবায় শুধু সদস্যদের স্বার্থে নয়, বৃহত্তর সমাজ ও পরিবেশের উন্নয়নেও দায়বদ্ধ। সামাজিক কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থিতিশীল সম্প্রদায় গঠনে সক্রিয় থাকে।

7. খোলা ও স্বেচ্ছামূলক সদস্যতা (Voluntary and Open Membership):

জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমবায়ে যোগ দেওয়ার অধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত—কোনো বৈষম্য বা শর্ত নেই।

এই নীতিমালাই সমবায়কে একটি সমাজ-নির্মাণকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যেখানে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায্যতা ও অংশীদারিত্ব মিলেমিশে গড়ে তোলে একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে

দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য পরস্পর মিশে রয়েছে, সেখানে সমবায় আন্দোলন শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়—বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক ন্যায্যতা ও গ্রামীণ পুনর্গঠনের একটি কার্যকর হাতিয়ার।

 ভারত:

ভারতে সমবায় আন্দোলনের সূচনা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়, ১৯০৪ সালে গৃহীত "Co-operative Credit Societies Act" এর মাধ্যমে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের ঋণদাতা মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা করা। স্বাধীনতার পর এই আন্দোলন নতুন গতি পায় এবং রাষ্ট্রীয় স্তরে সমবায়কে "inclusive development"-এর অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।বিশ্বখ্যাত ‘আমুল’ (Amul)—একটি দুগ্ধ উৎপাদক সমবায়, যা ভারতে “সাদা বিপ্লব”-এর পথপ্রদর্শক।IFFCO (Indian Farmers Fertiliser Cooperative Limited)—বিশ্বের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী সমবায়।SEWA (Self Employed Women’s Association)—নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে অনন্য মডেল।

বাংলাদেশ:

বাংলাদেশে সমবায় কাঠামো গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ডরূপে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪০-এর দশকে গঠিত বিভিন্ন কৃষি ও ঋণভিত্তিক সমবায় সমিতি পরবর্তীতে বিস্তৃত হয়ে জাতিগত, পেশাভিত্তিক এবং নারীভিত্তিক রূপ নেয়।বিশ্ববিখ্যাত গ্রামীণ ব্যাংক, যা মূলত ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সমবায় মডেল, দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।ব্র্যাক(BRAC)—একটি বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা, সমবায় চেতনার উপর ভিত্তি করেই গঠিত, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখছে।এছাড়াও কৃষিভিত্তিক সমিতি ও নারীকেন্দ্রিক সংস্থা গ্রামীণ পল্লিতে আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করছে।

 নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান:

এই দেশগুলোতেও সমবায় সংগঠনগুলো বিশেষ করে কৃষি, মৎস্যচাষ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও গ্রামীণ সঞ্চয় ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।নেপালে সমবায় সংস্থা “Sajha” একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্যোগ।শ্রীলঙ্কায়“Sanasa” আন্দোলন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে।পাকিস্তানে Cooperative Housing Societies নগরায়ন ও বসতবাড়ি নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সমবায় শুধুমাত্র একটি আর্থিক কাঠামো নয়—এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক পুনরুজ্জীবনের এক চলমান ধারাবাহিকতা, যেখানে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মানুষ নিজেই নিজের সমাজ গড়তে শেখে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সহযোগিতার দর্শন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু এক কবি, চিত্রশিল্পী বা সংগীতকার ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন সময়চেতন, মানবিক সমাজদার্শনিক। তাঁর সমাজচিন্তার কেন্দ্রে ছিল সহযোগের নৈতিকতা, যা শুধু সামাজিক ন্যায়ের প্রস্তাব নয়, বরং আত্মার মুক্তির এক পথনির্দেশ।

শান্তিনিকেতনের শিক্ষা-ভাবনা থেকে শুরু করে শ্রীনিকেতন প্রকল্প, গ্রামশিক্ষা কেন্দ্র, পল্লী সমিতি, এমনকি তাঁর “ব্রহ্মবিদ্যা” বিষয়ক চিন্তায়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি সমাজকে একটি জৈবিক ঐক্য হিসেবে দেখতেন, যেখানে মানুষের মুক্তি আসে সমবেত প্রয়াসের মাধ্যমে, একক ব্যক্তিচর্চার মাধ্যমে নয়।

তিনি গভীর উপলব্ধি থেকে বলেছিলেন—“যে আত্মাকে আমরা বিচ্ছিন্ন করি, সে আত্মা নয়; যে আত্মায় সমস্তকে ধরা যায়, সে-ই মুক্ত আত্মা।”

এই বক্তব্য কেবল ধর্মতাত্ত্বিক নয়, এটি এক সমষ্টিক সমাজচিন্তার মূলসূত্র। তাঁর মতে, মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে “আমি” থেকে “আমরা”-র দিকে অগ্রসর হয়।

শ্রীনিকেতনের "পল্লীসমিতি" ছিল একটি সামাজিক উদ্ভাবন, যেখানে কৃষক, কারিগর, শিক্ষক, এবং সংস্কৃতিকর্মীরা সমবেত হয়ে গড়ে তুলতেন অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, শিক্ষার প্রসার এবং সাংস্কৃতিক উন্মেষের এক সম্মিলিত চেতনা।

রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন—ভারতের পল্লীসমাজ কেবল অর্থনৈতিক অনটনে নয়, মনোবলহীনতা ও বিচ্ছিন্নতায় জর্জরিত। সেই সমাজকে জাগ্রত করতে হলে প্রয়োজন সহযোগের বন্ধন, যা দিয়ে মানুষ নিজেকে ও অপরকে বুঝতে শেখে।তিনি লিখেছিলেন:--- “সভ্যতা সেই এক, যেখানে আমরা অপরের আনন্দে আনন্দিত হই, অপরের কষ্টে কাতর হই।”এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের মূল মর্মার্থের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুতরাং রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতার দর্শন কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং মনুষ্যত্বের স্বরূপ নির্ধারণ করে। সমবায় তাঁর চোখে ছিল একটি আত্মিক ও সামাজিক পরিপূর্ণতার পথ—যেখানে ব্যক্তির বিকাশ ঘটেছে সমাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে, না যে সমাজ থেকে পৃথক হয়ে।

আজকের প্রাসঙ্গিকতা

একবিংশ শতকের বিশ্ব আজ বহুবিধ সংকটে নিমজ্জিত—বৈষম্যের প্রসার, নিঃস্ব মানুষের হাহাকার, সীমাহীন ভোগের প্রবণতা, এবং ক্রমাগত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের সভ্যতার ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্ধ প্রতিযোগিতা, লাভকেন্দ্রিক প্রবণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যেন আমাদের আরও একাকী করে তুলেছে।এই প্রেক্ষাপটে, সমবায় কেবল একটি আর্থিক মডেল নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক দর্শন—যা আমাদের শেখায় কিভাবে আমরা 'আমি' থেকে 'আমরা' হয়ে উঠতে পারি।

সমবায়:

একদিকে যেমন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন, যেখানে পুঁজির আধিপত্য নয়, বরং অংশগ্রহণ ও সমবণ্টনের উপর ভিত্তি করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা হয়,

তেমনি এটি একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থায়ী কাঠামো, যেখানে প্রতিটি সদস্যের কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় স্বচ্ছতার সঙ্গে,

আবার এটি সর্বোপরি একটি মানবিক জীবনচর্চার প্রস্তাব—যেখানে পরার্থপরতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

আজকের বিশ্ব যদি টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে ফিরতে হবে এমন এক ব্যবস্থার দিকে, যেখানে উন্নয়ন মানে হবে কেবল মুনাফা নয়, সহাবস্থান, সম্মান ও সংহতির জয়।

যেখানে প্রতিটি গ্রামীণ কৃষক, শহরের শ্রমজীবী নারী, প্রান্তিক কিশোর কিংবা প্রবীণ নাগরিক—সকলেই হয়ে উঠবে সমাজগঠনের সক্রিয় অংশীদার। এই ভাবনাই আজকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসকে করে তোলে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

উপসংহার

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস কেবল একটি দিন নয়—এটি একটি চলমান সামাজিক-নৈতিক আন্দোলনের প্রতীক। এটি এমন এক মানবিক চেতনার নাম, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযাত্রী হয়ে ওঠে। যেখানে “আমি”-র জগৎ ছাপিয়ে মানুষ পৌঁছায় “আমরা”-র বৃহত্তর বোধে। সহযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল নয়—এটি এক বিকল্প সভ্যতার ভাষা, যেখানে সমতা, ন্যায়, সম্মান ও সৌহার্দ্য একত্রে বাস করে।

এই দিন আমাদের নতুন করে শিখিয়ে দেয়—সমাজ গঠনের প্রকৃত পথ প্রতিযোগিতার মরীচিকায় নয়, বরং সহযোগের বিশ্বাসে। তাই আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—“প্রতিযোগ নয়, সহযোগ-ই হোক আমাদের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।” এই ভাবনা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতেও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর গান আমাদের হৃদয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়:

আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি

নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।

আন্‌ তবে বীণা--

সপ্তম সুরে বাঁধ্‌ তবে তান॥

পাশরিব ভাবনা, পাশরিব যাতনা,

রাখিব প্রমোদে ভরি দিবানিশি মনপ্রাণ।

আন্‌ তবে বীণা--

সপ্তম সুরে বাঁধ্‌ তবে তান॥

ঢালো ঢালো শশধর, ঢালো ঢালো জোছনা।

সমীরণ, বহে যা রে ফুলে ফুলে ঢলি ঢলি।

উলসিত তটিনী,

উথলিত গীতরবে খুলে দে রে মনপ্রাণ॥

--- এই সহভাগিতার গানই হোক আমাদের আগামী পথচলার প্রেরণা। “সহযোগিতাই সমবৃদ্ধির চাবিকাঠি”।

০৫/০৭/২০২৫

*****

তথ্যসূত্র (References):

1. International Co-operative Alliance (ICA) Official Website:

 https://www.ica.coop/en

2. United Nations — International Day of Cooperatives:

 https://www.un.org/en/observances/cooperatives-day

3. International Labour Organization (ILO) — Cooperatives Unit:

 https://www.ilo.org/global/topics/cooperatives/lang--en/index.htm

4. Rochdale Pioneers Museum (Co-operative Heritage Trust, UK):

 https://www.rochdalepioneersmuseum.coop/

5. Government of India — National Cooperative Development Corporation (NCDC):

 https://www.ncdc.in/

6. Amul India (Gujarat Cooperative Milk Marketing Federation):

 https://amul.com/

7. Indian Farmers Fertiliser Cooperative Limited (IFFCO):

 https://www.iffco.in/

8. Self Employed Women’s Association (SEWA):

 https://www.sewa.org/

9. Grameen Bank, Bangladesh:

 https://www.grameen.com/

10. BRAC Bangladesh:

 https://www.brac.net/

11. International Journal of Rural Management – “Cooperatives in South Asia: Challenges and Prospects”

12. Rabindranath Tagore’s writings on rural reconstruction:

Tagore, R. (1928).  Letters to Rathindranath, Palli Prakriti, Palli Samaj

(Collected in “Rabindra Rachanabali”, Vol. 22, Visva-Bharati Publications) 

13. Tagore, R. (Selected Songs and Poems) — Sanchayita, Visva-Bharati

14. Bangladesh Department of Cooperatives (Govt. of Bangladesh):

 https://www.coop.gov.bd/

15. Cooperative Development Foundation (India):

 https://cdf-india.org/


।।আস্তিক।।

 Guest Column

         Buddhadeb Gorai         

by Pexels


আমি আস্তিক,  ঈশ্বরে বিশ্বাস করি।

তাই তাঁকে খুব ডাকি,

যখন হটাৎ কোন বিপদে পরি।

আমি স্বর্গ-নরক-আত্মায় বিশ্বাস করি।

তাই তো কালেভদ্রে ভালো কাজ করি,

এবং তার খুব প্রচার করি।

যাতে কর্মনীতি প্রসন্ন হয়।

আমি কর্মনীতি খুব মানি,

আমি জানি, খারাপ কাজের ফল খারাপ।

তাও সর্বদা খারাপই করি,

আর সেগুলি সযত্নে ঢেকে রাখি,

পাছে কর্মনীতি উল্লঙ্ঘন হয়।

আমি আস্তিক,  ঈশ্বরে বিশ্বাস করি।

তাই তাঁকে খুব ডাকি।

যখন হটাৎ কোন বিপদে পরি।

আমি নিজেকে অবিশ্বাস করি,

তাই অফিস আলমারিতে তালা দিয়ে

বেরোনোর সময়, অন্তত তিন-চার বার তো টানি,

দেখি ঠিক আছে নাকি।

আমি আমার গর্ভধারীনি মা কেও অবিশ্বাস করি

তাই তাঁকে অনেক মিথ্যা বলে, বোকা ভেবে,

সবশেষে নিজেই ফাঁদে পরি।

আমি আমার প্রিয়তমাকেও অবিশ্বাস করি,

তাই বাল্য-বন্ধুকেও বাইরে দেখা করি।

ভিতরে আসতে বলিনা, প্রয়োজনে ফোন করি।

আমি আমার প্রিয় বন্ধুকেও অবিশ্বাস করি,

তাই বিপদে পরলে তাকে ফোন করি।

সে বিপদতারণ হয়ে আসে, পাশে বসে।

গল্প করে, সাহস দেয় এবং ভালোবাসে।

কিন্তু আমি আস্তিক, ঈশ্বরে বিশ্বাস করি

তাই তাঁকে খুব ডাকি,

যখন হটাৎ কোন বিপদে পরি।

ভবিষ্যতের ভাবনা ও মূল্যবোধের সন্ধানে: দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা

In Search of Future Thinking and Values: The Possibilities of Higher Education in Philosophy

 Guest Column

Buddhadeb Gorai

Assistant Professor in Philosophy, Deshbandhu College for Girls, Calcutta University

Pexels

ভাবনার ভিত্তি প্রস্তুতীর সময়: কেন পড়বেন দর্শনশাস্ত্র?

আমরা সবাই জানি, জীবনের দৌড়ে কে আগে পৌঁছবে, তা আজকের সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই দৌড় কোথায় যাচ্ছে? কেন দৌড়াচ্ছি আমরা? দৌড়ের শেষে কী আছে? এই প্রশ্নগুলো আমরা ক’জন করি?

ঠিক এখানেই দর্শনশাস্ত্রের আবির্ভাব। দর্শনশাস্ত্রের ‘দর্শন’ শব্দটির মধ্যেই আছে জগতকে অন্য চোখে দেখার এক আমন্ত্রণ। দর্শনশাস্ত্রের ইংরাজী প্রতিশব্দ হল ‘Philosophy’ এই শব্দটির অর্থই হচ্ছে—‘জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা’। এটি এমন একটি বিষয়, যা কেবল তথ্যভিত্তিক পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং শেখায় কিভাবে ভাবতে হয়। আজকের জটিল ও বিভ্রান্তিকর সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন চিন্তাশীল, যুক্তিনিষ্ঠ, ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠা খুব জরুরি। দর্শনশাস্ত্র সেই মানসিক কাঠামো গড়ে তোলে, যেখানে কেবল উত্তর নয়—সঠিক প্রশ্ন করাও একধরনের শক্তি।

 “Philosophy” মানে শুধু ভাবুকদের প্রাচীন তত্ত্ব নয়—এ হল চিন্তা করার সাহস, প্রশ্ন করার অধিকার, ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি, যুক্তিকে শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি। দর্শনশাস্ত্র জিজ্ঞাসা করে—“আমি কে?”, “আমি কীভাবে জানব, যে আমি যা জানি তা সত্য?”, “সত্য কী?”, “নৈতিকতা কোথা থেকে আসে?”, “একটি রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত?” — এমন অসংখ্য গভীর প্রশ্নের পথ দেখায় দর্শনশাস্ত্র।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির জোয়ার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট, তখন মানুষের অন্তর্জ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দর্শনশাস্ত্র আমাদের সেই আলো দেয়—যে আলো শুধু চাকরি পাওয়ার পথ নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার পথ দেখায়।

এটি এমন একটি বিষয় যেখানে ‘কেন’ প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়। কেন আমি এই কাজটি করব? কেন আমি এই নিয়ম মানব? দর্শনশাস্ত্র আমাদের শেখায়—যথাযথ যুক্তির ভিত্তিতে জীবনকে গড়ে তুলতে। যারা নৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক হতে চান, সমাজ নিয়ে ভাবেন, রাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন করতে চান, এবং জীবনের অর্থ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন হতে ভালোবাসেন—তাদের কাছে দর্শনশাস্ত্র এক অপার সম্ভাবনার জগৎ।

দর্শনশাস্ত্র পড়লে কী শেখা যায়?

জ্ঞান শুধু তথ্যের সঞ্চয় নয়, বরং জগতকে বুঝে ওঠার একটি শিল্প। দর্শনশাস্ত্র সেই শিল্পের ভিত্তি—যা আমাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন তুলতে শেখায় এবং মানবিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সাহায্য করে। নিচে দেওয়া হলো দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়নের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি:

১. বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা (Critical Thinking)
দর্শনশাস্ত্র আমাদের শেখায়—কিভাবে প্রশ্নকে ভাঙতে হয়, যুক্তিকে সাজাতে হয়, এবং প্রতিটি চিন্তার কাঠামোকে পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হয়। যুক্তিবিদ্যা (Logic), জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology), নীতিশাস্ত্র (Ethics), সমাজ ও রাষ্ট্রদর্শনের (Social and Political Philosophy) মতো শাখাগুলি শেখায় কিভাবে একটি ভাবনার ভিতরেই লুকিয়ে থাকে বহু স্তর এবং বিকল্প পাঠ।
এটি একজন শিক্ষার্থীকে করে তোলে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষক, যে যেকোনো তথ্য বা পরিস্থিতিকে বৌদ্ধিক ও বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে পারে।

২. নৈতিক স্পষ্টতা ও বিচারক্ষমতা (Moral Clarity & Judgement)
"বিজ্ঞান বলে কী করা সম্ভব, দর্শনশাস্ত্র বলে কী করা উচিত।"
এই কথার মূলে রয়েছে দর্শনশাস্ত্রের নৈতিক ও নীতিভিত্তিক গভীরতা। সমকালীন সমাজে যখন আমরা প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব, সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হই, তখন দর্শনশাস্ত্র আমাদের বিবেক ও নৈতিক বোধকে দৃঢ় করে তোলে।

চিকিৎসা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনীতি বা রাজনীতি—সবখানেই ন্যায়ের প্রশ্নে, অধিকার ও দায়বদ্ধতার জায়গায় দর্শনশাস্ত্রের অনুশীলন একজন মানুষকে পরিণত করে সচেতন ও দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে।

৩. প্রশ্ন করার সাহস (The Courage to Question)
"সত্য কেবল খোঁজার বস্তু নয়, প্রশ্নের মধ্য দিয়েই তা জন্ম নেয়।"
দর্শনশাস্ত্র এমন এক চর্চা যা আত্মা, ঈশ্বর, জগত, সময়, পরিণতি, অধিকার, দায়—এইসব মৌলিক প্রশ্নগুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।
দর্শনশাস্ত্র শেখায়—প্রতিষ্ঠিত ধারণা মানেই চূড়ান্ত নয়। তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার, তার যৌক্তিকতা যাচাই করার এবং কখনও তাকে অস্বীকার করার সাহস তৈরি করাও একধরনের জ্ঞানচর্চা।
এই প্রশিক্ষণ একজন মানুষকে করে তোলে গভীর, ন্যায়নিষ্ঠ ও চিন্তাশীল—যে কেবল উত্তর জানে না, বরং সঠিক প্রশ্ন করতে পারে।

আজকের পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে দর্শনশাস্ত্র এমন এক মননচর্চার ক্ষেত্র, যা শিক্ষার্থীদের কেবলমাত্র চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে তোলে না, বরং চিন্তাশীল, বিবেকবান, ও মানবিকভাবে দায়বদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠার পথ দেখায়।

দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগসুবিধা:

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে শুধু ভালো চাকরি পাওয়াই নয়, মানুষের উচিত হয়ে উঠছে আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ, ন্যায়বোধের নির্মাণ এবং যুক্তিনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন। এই পরিপ্রেক্ষিতে দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যেন জীবনের অন্তঃস্বরের একটি গভীর অনুশীলন, একটি অন্তর্জগতে প্রবেশ।

দর্শনশাস্ত্র কেবল একটি বিষয় নয়, এটি ভাবনার একটি অভ্যাস, নৈতিকতার একটি অনুশীলন, এবং জীবনের প্রতিটি প্রশ্নকে জিজ্ঞাসা করার এক সাহসী পন্থা। তাই দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুবিধাগুলি বহুমাত্রিক ও গভীরতর:

১. চিন্তার শুদ্ধতা ও যুক্তির দীপ্তি
দর্শনশাস্ত্র শেখায় কীভাবে চিন্তা করতে হয়। এটি একধরনের ‘মননশীল ব্যায়াম’, যা বুদ্ধির শাণিত ব্যবহার এবং যুক্তির প্রাঞ্জল প্রয়োগ ঘটায়। দর্শনশাস্ত্রের ছাত্রছাত্রীরা যে কোনো সমস্যাকে বিশ্লেষণ করে দেখার, এবং নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার অনন্য ক্ষমতা অর্জন করে।

২. নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তি নির্মাণ
জীবনের কোন পথে চলা উচিত? কী করলে তা ন্যায়সঙ্গত হয়?—এইসব প্রশ্ন দর্শনশাস্ত্রের প্রাণ। নৈতিকতা (Ethics), দায়বদ্ধতা, কর্তব্যবোধ ও মানবিক বিবেক দর্শনশাস্ত্রের ছাত্রদের ভেতর গড়ে ওঠে এক অবিচল মেরুদণ্ডের মতো। আজকের সমাজে এমন নৈতিক মানুষ সবচেয়ে জরুরি।

৩. উচ্চতর গবেষণার অবারিত সুযোগ
দর্শনশাস্ত্রশাস্ত্রে অনার্স করার পর MA, M.Phil (Just Obsolate), Ph.D-এর পথ খোলা রয়েছে। দর্শনশাস্ত্রের গবেষণা শুধু প্রাচীন পাণ্ডিত্যচর্চা নয়—সমাজ, প্রযুক্তি, পরিবেশ, জেন্ডার, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের নৈতিক প্রশ্নগুলিও আজ দর্শনশাস্ত্রের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত। ভারতের নানান বড় ছোট বিশ্ববিদ্যালয় (JNU, DU, JU, BU, CU, Presidency, Visva-Bharati) এবং কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ের গবেষণার দিগন্ত বিস্তৃত। এছাড়াও বহির্বিশ্ব তো আছেই ।

৪. শিক্ষকতা ও একাডেমিক ক্যারিয়ার
UGC-NET ও SET উত্তীর্ণ হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা একটি মর্যাদাপূর্ণ পথ। পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ে দর্শনশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, নৈতিকতা ও মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবেও উচ্চ চাহিদা রয়েছে। লেখাপড়ার প্রতি যাদের ভালোবাসা, তাদের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ পথ।

৫. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দৃঢ় সহায়
IAS, IPS, WBCS, PSC, SSC-এর মতো পরীক্ষায় দর্শনশাস্ত্র একটি অত্যন্ত scoring ও বিশ্লেষণভিত্তিক বিকল্প বিষয়। নৈতিকতা, যুক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা দর্শনশাস্ত্রের মূল বিষয় হওয়ায় এই পরীক্ষাগুলিতে এটি বিশেষ সুবিধা এনে দেয়।

৬.সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও চিন্তানায়ক হবার পথ
দর্শনশাস্ত্রশাস্ত্রের শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠেন সমাজমনস্ক চিন্তক, দার্শনিক প্রাবন্ধিক, মানবিক সাংবাদিক। বিশ্লেষণধর্মী লেখায়, সামাজিক প্রশ্ন উত্থাপনে, এবং বাস্তবতাকে মানবিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।

৭. নীতিনির্ধারণ, এনজিও ও মানবাধিকার ক্ষেত্রে
রাষ্ট্রনীতি, জেন্ডার ন্যায়, পরিবেশ নৈতিকতা বা প্রযুক্তির দায়বদ্ধতা—এসব ক্ষেত্রে দর্শনশাস্ত্রের ছাত্রদের বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত কার্যকর। Amnesty International, UN, Oxfam-এর মতো সংস্থায় তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

৮. কর্পোরেট ও প্রযুক্তিখাতে নৈতিক পরামর্শদাতা
বিজ্ঞান যত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, নৈতিক প্রশ্ন ততটাই জটিল হয়ে উঠছে। দর্শনশাস্ত্রের জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি নৈতিকতা (AI Ethics, Bioethics), কর্পোরেট নীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বহু কর্পোরেট সংস্থাই এখন দর্শনশাস্ত্রের ছাত্রদের নিয়োগ দিচ্ছে নীতি ও সংকট পর্যালোচনার কাজে।

শেষকথা:

শেষমেশ দর্শনশাস্ত্র আমাদের শেখায়—‘কে আমি? কেন আমি ভাবি? কী করলে তা ন্যায়ের পথে পড়ে?’ এইসব মৌলিক প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই তো আমাদের মনুষ্যত্বের পরিচয়। যারা শুধু চাকরি নয়, একটি গভীর জীবনবোধের সঙ্গে বেড়ে উঠতে চান, তাদের জন্য দর্শনশাস্ত্র এক আত্মিক ও জাগতিক দু’পথেই আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।

এমন এক সময়ে যখন “চাকরি” আর “নিরাপত্তা” হয়ে উঠছে শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড, তখন দর্শনশাস্ত্র বলছে—"ভাবো, প্রশ্ন করো, বুঝে ওঠো, কারণ তবেই তুমি সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারো।"

দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র হওয়া মানে কেবল শিক্ষিত হওয়া নয়, বরং একজন ‘চিন্তাশীল মানুষ’ হয়ে ওঠার সাহস নেওয়া।আজকের সময়ে ‘ফলাফল’ নয়, ‘ভিত্তি’ গড়ে তোলা জরুরি। দর্শনশাস্ত্র এমন একটি বিষয়, যা একজন মানুষকে শুধু কর্মজীবনে নয়—জীবনবোধেও পরিণত করে। যখন চারপাশে তথ্যের জঙ্গল, তখন সত্যের খোঁজে যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তার পাঠ শেখায় দর্শনশাস্ত্র। তাই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর, যারা জীবন ও জগত নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে চান, ন্যায় ও সত্যের দিকচিহ্ন অনুসরণ করে চলতে চান—তাদের জন্য দর্শনশাস্ত্র এক অনোন্য ও প্রাসঙ্গিক পথ।

এই সময়ে, যখন জীবনের লক্ষ্য  চাকরি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে  একটি অর্থপূর্ণ জীবন, তখন দর্শনশাস্ত্রের মতো বিষয় হবে একটি অনন্য উপহার। তাই সদ্য উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের বলব—ভবিষ্যতের জন্য ভাবুন, নিজের মধ্যে ভাবনার সঞ্চার হোক, নিজের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি হোক—এই সবকিছুর জন্য দর্শনশাস্ত্র একটি শক্তিশালী পথ।ভাবুন, প্রশ্ন করুন, চিন্তা করুন—আর দর্শনশাস্ত্রের পথ বেছে নিন।এই সময়টাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নিজেকে জানতে হলে, সমাজকে বদলাতে হলে, চিন্তাকে শাণিত করতে হলে—‘দর্শনশাস্ত্র’ হোক তোমার জ্ঞানযাত্রার শুরু।

WhatsApp Image 2025-05-15 at 7.18.06 PM (1).jpeg

দর্শনশাস্ত্রশাস্ত্রে অনার্সসহ বিএ-এর পর উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সম্ভাব্য পথ
— ভাবনার শক্তি থেকে পেশাগত পরিণতি

ধাপ ১: B.A. with Philosophy Honours (দর্শনশাস্ত্র অনার্স সহ বি.এ.)
এই স্তরেই গড়ে ওঠে যুক্তি, বিশ্লেষণ, নৈতিকতা ও মননশীলতার ভিত্তি।

B.Ed. (বি.এড.) সম্পন্ন করলে:
বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা (School Teaching – মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে) 
SSC(School Service Commission)-এর মাধ্যমে সরকার অনুমোদিত স্কুলে চাকরি 

মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ ও শংসাপত্র নিলে:
মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শদাতা (Psychological Counsellor) 
NGO, কর্পোরেট অথবা স্বনির্ভর পরামর্শক হিসেবে কাজ 

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দর্শনশাস্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
WBCS(West Bengal Civil Service Commission), IAS(Indian Administrative Service) সহ অন্যান্য রাজ্যের  সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বিকল্প বিষয় হিসেবে দর্শনশাস্ত্রের বিশাল চাহিদা অনেক এছাড়াওনৈতিকতা, যুক্তিবিদ্যা ও সামাজিক ভাবনার পটভূমিতে এগিয়ে থাকা সম্ভব 

ধাপ ২: M.A. in Philosophy (দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর)
এখানে চিন্তা আরও গভীর হয়, গড়ে ওঠে গবেষণার প্রবণতা ও বিশ্লেষণমূলক দক্ষতা।

ধাপ ৩:
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সম্ভাবনা
CSC (College Service Commission) বা PSC (Public Service Commission)-এর মাধ্যমে নিয়োগ 
দর্শনশাস্ত্র বিষয়ে অধ্যাপনা, গবেষণা ও পঠন-পাঠনকেন্দ্রিক ক্যারিয়ার 

ধাপ ৪: Ph.D.
গবেষণামূলক শিক্ষার এই স্তর আপনাকে ভাবনায় নেতৃত্বদাতা করে তোলে।
ন্যায়নীতি, রাজনৈতিক দর্শনশাস্ত্র, ফেমিনিজম, পরিবেশ নৈতিকতা, দর্শনশাস্ত্রশাস্ত্রের ইতিহাস ইত্যাদিতে গবেষণা 
আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ ও রিসার্চ ফেলোশিপের সুযোগ 

ধাপ ৫:
NET / SET উত্তীর্ণ হলে:
ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে স্থায়ী অধ্যাপনার পথ উন্মুক্ত 
Junior Research Fellowship (JRF) প্রাপ্তির সম্ভাবনা 

ধাপ ৬:
বিভিন্ন সামাজিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, গবেষণা সংস্থা ও কল্যাণ পরিষেবায় চাকরি
যেমনঃ Indian Council of Philosophical Research (ICPR), ICSSR, NGOs, থিংক ট্যাঙ্ক, শিক্ষা ও উন্নয়ন সংস্থা 
নীতিনির্ধারণ, মানবাধিকার, পরিবেশ, জেন্ডার, শিক্ষা, সংস্কৃতি সংক্রান্ত প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা 

----