Guest Column
(International Day of Cooperatives)
by
Buddhadeb Gorai
ভূমিকা
"সহযোগেই মানুষের মুক্তি, প্রতিযোগে নয়।"— মহামানব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫ জুলাই (শনিবার) ২০২৫—একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যেদিন বিশ্বমঞ্চে উদ্যাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস (International Day of Cooperatives)। এ দিনটি যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজ বিনির্মাণের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে একক প্রয়াসের নয়, বরং সমবেত উদ্যোগের মধ্যে।
যেখানে প্রতিযোগিতার দৌড়ে মানুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, সেখানে সমবায় চেতনা মানুষকে করে তোলে পরস্পরের সহযাত্রী। ব্যক্তি-নির্ভর পুঁজিবাদী উন্নয়নের জোয়ারে যখন সমাজ প্লাবিত, তখন এই দিবস এক বিকল্প আলোকবর্তিকা নিয়ে আসে—যেখানে সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব এবং সমানাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এক সহমর্মী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের রূপরেখা।এই দিনটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়—এ যেন এক মূল্যবোধের অনুশীলন, এক সামাজিক ও নৈতিক আহ্বান:--“তুমি একা নও, একসাথে পথ হোক উত্তরণের।”
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস তাই আমাদের কাছে কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ—যা উন্নয়নকে অর্থের বিচারে নয়, মানবিকতা ও সংহতির পরিমাপে বিচার করে।
দিবসটির সূচনা ও স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের শিকড় নিহিত রয়েছে উনিশ শতকের সমাজ পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। ১৮৪৪ সালে, ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার অঞ্চলের রোচডেল শহরে একদল বুননশিল্পী শ্রমিক গড়ে তোলেন “Rochdale Society of Equitable Pioneers” নামক একটি সমবায় সংস্থা। এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যে পরিচালিত প্রথম আধুনিক ও সংগঠিত সমবায় উদ্যোগ। এই সংস্থাই “Rochdale Principles” নামে পরিচিত সমবায়ের সাতটি মৌলিক নীতি রূপ দেয়, যা আজও বিশ্বের সমবায় কাঠামোর ভিত্তি।
এরপর সময়ের পরিক্রমায়, ১৮৯৫ সালে গঠিত হয় International Co-operative Alliance (ICA)—যা বিশ্বব্যাপী সমবায় আন্দোলনের ছাতাসংগঠন। ICA ১৯২৩ সাল থেকে প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস পালন শুরু করে, যাতে বিশ্ববাসী সমবায়ের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারে।
১৯৯২ সালে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ICA-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালে—যা ছিল ICA-এর শতবর্ষপূর্তি বছর—থেকে দিবসটি জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসটি জাতিসংঘের “সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (SDGs)” এর সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত, বিশেষত দারিদ্র্য দূরীকরণ, লিঙ্গ-সমতা, ন্যায্য কর্মসংস্থান ও সুস্থায়ী সম্প্রদায় গঠনের লক্ষ্যে।আজ এই দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মারক নয়, বরং বিশ্বব্যাপী এক নৈতিক ও সামাজিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ—যেখানে ব্যক্তির থেকে গোষ্ঠী, প্রতিযোগিতার থেকে সহযোগ, এবং লাভের থেকে দায়িত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের থিম--"Cooperatives: Building a Better Future for All"
বাংলা অর্থ: “সমবায়: সবার জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক”
২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের এই বার্তাটি নিছক একটি স্লোগান নয়; এটি এক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান, যা বর্তমান বৈষম্যপূর্ণ, সংকটপূর্ণ এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকটের প্রেক্ষিতে সমবায়ের ভূমিকাকে নতুন আলোয় তুলে ধরে।
এই থিমটি মূলত তিনটি মৌলিক বোধকে কেন্দ্রীভূত করে:
1. অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন (Inclusive Development):
যেখানে সবাই—নারী, শিশু, শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। সমবায় কাঠামো এই অন্তর্ভুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
2. মানবিক অর্থনীতি (Human-centered Economy):
সমবায়ের দর্শন লাভ নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন ও সম্মানকে প্রাধান্য দেয়। তাই এটি একটি "মানুষ-কেন্দ্রিক" বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরি করে, যা ব্যক্তিস্বার্থের উপরে গোষ্ঠীর মঙ্গলকে স্থান দেয়।
3. সুস্থায়ী ভবিষ্যৎ নির্মাণ (Sustainable Future):
জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতা—এই সংকটগুলো মোকাবিলায় সমবায় একটি ন্যায্য ও সহনশীল কাঠামো প্রদান করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান রক্ষায় সহায়ক।
এই থিমের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—সমবায় শুধু উৎপাদনের একটি ব্যবস্থা নয়, এটি সমাজ বিনির্মাণের এক নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি।এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে জিজ্ঞাসা তোলে—“উন্নয়ন কার জন্য? উন্নয়ন কাদের সঙ্গে নিয়ে?”
আন্তর্জাতিক সমবায় সংঘ (ICA) এই থিমের আওতায় ২০২৫ সালে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে—
1. নারীদের নেতৃত্বে সমবায়
2. যুবসমাজের অংশগ্রহণ
3. ডিজিটাল ও সবুজ সমবায় উদ্যোগ
4. স্থানীয় সম্পদের উপর ভিত্তি করে সুস্থায়ী কর্মসংস্থান
এইভাবে, ২০২৫ সালের থিমটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—সহযোগ, সমতা ও সংহতির ভিত্তিতে গড়ে উঠুক এমন এক বিশ্ব, যেখানে উন্নয়ন কারো একার সম্পদ নয়—বরং সবার অধিকার।
সমবায়ের মৌলিক নীতি: “Rochdale Principles”
১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রোচডেল শহরে গঠিত “Rochdale Society of Equitable Pioneers” আধুনিক সমবায় আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। এই সংগঠনটি সমবায় পরিচালনার জন্য যে সাতটি নৈতিক ও কার্যকর নীতি নির্ধারণ করেছিল, তা পরবর্তীতে “Rochdale Principles” নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়।
এই সাতটি নীতি শুধু ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম নয়, বরং একটি মানবিক ও ন্যায্য সমাজ গঠনের রূপরেখা:
1. গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ (Democratic Member Control):
সমবায়ে প্রত্যেক সদস্যের সমান অধিকার থাকে। “এক সদস্য, এক ভোট” নীতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়—চাই সে যত বড় বিনিয়োগকারী হোক বা ছোট। এটি সমবায়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিশ্চিত করে।
2. অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (Member Economic Participation):
সদস্যরা সমবায়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেন এবং লাভের ন্যায্য অংশ পান। লাভের বিতরণ করা হয় সদস্যদের ব্যবহারের পরিমাণ অনুসারে, কেবল মূলধনের অনুপাতে নয়—এটাই মূল পার্থক্য পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
3. স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা (Autonomy and Independence):
সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের সদস্যদের দ্বারা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। কোনো সরকারি বা বেসরকারি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের স্বার্থে কাজ করে।
4. শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্য (Education, Training and Information):
সদস্যদের সচেতন ও সক্ষম করে তুলতে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে সমবায়ের চেতনা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জানানো হয়।
5. পরস্পর সহযোগিতা (Cooperation among Cooperatives):
সমবায় সংস্থাগুলি পরস্পরের সঙ্গে ন্যায্য ও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় যুক্ত থাকে—স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। এতে একটি বৃহত্তর সমবায় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
6. সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব (Concern for Community):
সমবায় শুধু সদস্যদের স্বার্থে নয়, বৃহত্তর সমাজ ও পরিবেশের উন্নয়নেও দায়বদ্ধ। সামাজিক কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থিতিশীল সম্প্রদায় গঠনে সক্রিয় থাকে।
7. খোলা ও স্বেচ্ছামূলক সদস্যতা (Voluntary and Open Membership):
জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমবায়ে যোগ দেওয়ার অধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত—কোনো বৈষম্য বা শর্ত নেই।
এই নীতিমালাই সমবায়কে একটি সমাজ-নির্মাণকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যেখানে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায্যতা ও অংশীদারিত্ব মিলেমিশে গড়ে তোলে একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে
দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য পরস্পর মিশে রয়েছে, সেখানে সমবায় আন্দোলন শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়—বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক ন্যায্যতা ও গ্রামীণ পুনর্গঠনের একটি কার্যকর হাতিয়ার।
ভারত:
ভারতে সমবায় আন্দোলনের সূচনা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়, ১৯০৪ সালে গৃহীত "Co-operative Credit Societies Act" এর মাধ্যমে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের ঋণদাতা মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা করা। স্বাধীনতার পর এই আন্দোলন নতুন গতি পায় এবং রাষ্ট্রীয় স্তরে সমবায়কে "inclusive development"-এর অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।বিশ্বখ্যাত ‘আমুল’ (Amul)—একটি দুগ্ধ উৎপাদক সমবায়, যা ভারতে “সাদা বিপ্লব”-এর পথপ্রদর্শক।IFFCO (Indian Farmers Fertiliser Cooperative Limited)—বিশ্বের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী সমবায়।SEWA (Self Employed Women’s Association)—নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে অনন্য মডেল।
বাংলাদেশ:
বাংলাদেশে সমবায় কাঠামো গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ডরূপে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪০-এর দশকে গঠিত বিভিন্ন কৃষি ও ঋণভিত্তিক সমবায় সমিতি পরবর্তীতে বিস্তৃত হয়ে জাতিগত, পেশাভিত্তিক এবং নারীভিত্তিক রূপ নেয়।বিশ্ববিখ্যাত গ্রামীণ ব্যাংক, যা মূলত ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সমবায় মডেল, দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।ব্র্যাক(BRAC)—একটি বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা, সমবায় চেতনার উপর ভিত্তি করেই গঠিত, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখছে।এছাড়াও কৃষিভিত্তিক সমিতি ও নারীকেন্দ্রিক সংস্থা গ্রামীণ পল্লিতে আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করছে।
নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান:
এই দেশগুলোতেও সমবায় সংগঠনগুলো বিশেষ করে কৃষি, মৎস্যচাষ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও গ্রামীণ সঞ্চয় ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।নেপালে সমবায় সংস্থা “Sajha” একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্যোগ।শ্রীলঙ্কায়“Sanasa” আন্দোলন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে।পাকিস্তানে Cooperative Housing Societies নগরায়ন ও বসতবাড়ি নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
সংক্ষেপে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সমবায় শুধুমাত্র একটি আর্থিক কাঠামো নয়—এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক পুনরুজ্জীবনের এক চলমান ধারাবাহিকতা, যেখানে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মানুষ নিজেই নিজের সমাজ গড়তে শেখে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সহযোগিতার দর্শন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু এক কবি, চিত্রশিল্পী বা সংগীতকার ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন সময়চেতন, মানবিক সমাজদার্শনিক। তাঁর সমাজচিন্তার কেন্দ্রে ছিল সহযোগের নৈতিকতা, যা শুধু সামাজিক ন্যায়ের প্রস্তাব নয়, বরং আত্মার মুক্তির এক পথনির্দেশ।
শান্তিনিকেতনের শিক্ষা-ভাবনা থেকে শুরু করে শ্রীনিকেতন প্রকল্প, গ্রামশিক্ষা কেন্দ্র, পল্লী সমিতি, এমনকি তাঁর “ব্রহ্মবিদ্যা” বিষয়ক চিন্তায়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি সমাজকে একটি জৈবিক ঐক্য হিসেবে দেখতেন, যেখানে মানুষের মুক্তি আসে সমবেত প্রয়াসের মাধ্যমে, একক ব্যক্তিচর্চার মাধ্যমে নয়।
তিনি গভীর উপলব্ধি থেকে বলেছিলেন—“যে আত্মাকে আমরা বিচ্ছিন্ন করি, সে আত্মা নয়; যে আত্মায় সমস্তকে ধরা যায়, সে-ই মুক্ত আত্মা।”
এই বক্তব্য কেবল ধর্মতাত্ত্বিক নয়, এটি এক সমষ্টিক সমাজচিন্তার মূলসূত্র। তাঁর মতে, মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে “আমি” থেকে “আমরা”-র দিকে অগ্রসর হয়।
শ্রীনিকেতনের "পল্লীসমিতি" ছিল একটি সামাজিক উদ্ভাবন, যেখানে কৃষক, কারিগর, শিক্ষক, এবং সংস্কৃতিকর্মীরা সমবেত হয়ে গড়ে তুলতেন অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, শিক্ষার প্রসার এবং সাংস্কৃতিক উন্মেষের এক সম্মিলিত চেতনা।
রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন—ভারতের পল্লীসমাজ কেবল অর্থনৈতিক অনটনে নয়, মনোবলহীনতা ও বিচ্ছিন্নতায় জর্জরিত। সেই সমাজকে জাগ্রত করতে হলে প্রয়োজন সহযোগের বন্ধন, যা দিয়ে মানুষ নিজেকে ও অপরকে বুঝতে শেখে।তিনি লিখেছিলেন:--- “সভ্যতা সেই এক, যেখানে আমরা অপরের আনন্দে আনন্দিত হই, অপরের কষ্টে কাতর হই।”এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের মূল মর্মার্থের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুতরাং রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতার দর্শন কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং মনুষ্যত্বের স্বরূপ নির্ধারণ করে। সমবায় তাঁর চোখে ছিল একটি আত্মিক ও সামাজিক পরিপূর্ণতার পথ—যেখানে ব্যক্তির বিকাশ ঘটেছে সমাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে, না যে সমাজ থেকে পৃথক হয়ে।
আজকের প্রাসঙ্গিকতা
একবিংশ শতকের বিশ্ব আজ বহুবিধ সংকটে নিমজ্জিত—বৈষম্যের প্রসার, নিঃস্ব মানুষের হাহাকার, সীমাহীন ভোগের প্রবণতা, এবং ক্রমাগত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের সভ্যতার ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্ধ প্রতিযোগিতা, লাভকেন্দ্রিক প্রবণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যেন আমাদের আরও একাকী করে তুলেছে।এই প্রেক্ষাপটে, সমবায় কেবল একটি আর্থিক মডেল নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক দর্শন—যা আমাদের শেখায় কিভাবে আমরা 'আমি' থেকে 'আমরা' হয়ে উঠতে পারি।
সমবায়:
একদিকে যেমন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন, যেখানে পুঁজির আধিপত্য নয়, বরং অংশগ্রহণ ও সমবণ্টনের উপর ভিত্তি করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা হয়,
তেমনি এটি একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থায়ী কাঠামো, যেখানে প্রতিটি সদস্যের কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় স্বচ্ছতার সঙ্গে,
আবার এটি সর্বোপরি একটি মানবিক জীবনচর্চার প্রস্তাব—যেখানে পরার্থপরতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
আজকের বিশ্ব যদি টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে ফিরতে হবে এমন এক ব্যবস্থার দিকে, যেখানে উন্নয়ন মানে হবে কেবল মুনাফা নয়, সহাবস্থান, সম্মান ও সংহতির জয়।
যেখানে প্রতিটি গ্রামীণ কৃষক, শহরের শ্রমজীবী নারী, প্রান্তিক কিশোর কিংবা প্রবীণ নাগরিক—সকলেই হয়ে উঠবে সমাজগঠনের সক্রিয় অংশীদার। এই ভাবনাই আজকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসকে করে তোলে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।
উপসংহার
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস কেবল একটি দিন নয়—এটি একটি চলমান সামাজিক-নৈতিক আন্দোলনের প্রতীক। এটি এমন এক মানবিক চেতনার নাম, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযাত্রী হয়ে ওঠে। যেখানে “আমি”-র জগৎ ছাপিয়ে মানুষ পৌঁছায় “আমরা”-র বৃহত্তর বোধে। সহযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল নয়—এটি এক বিকল্প সভ্যতার ভাষা, যেখানে সমতা, ন্যায়, সম্মান ও সৌহার্দ্য একত্রে বাস করে।
এই দিন আমাদের নতুন করে শিখিয়ে দেয়—সমাজ গঠনের প্রকৃত পথ প্রতিযোগিতার মরীচিকায় নয়, বরং সহযোগের বিশ্বাসে। তাই আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—“প্রতিযোগ নয়, সহযোগ-ই হোক আমাদের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।” এই ভাবনা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতেও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর গান আমাদের হৃদয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়:
আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি
নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।
আন্ তবে বীণা--
সপ্তম সুরে বাঁধ্ তবে তান॥
পাশরিব ভাবনা, পাশরিব যাতনা,
রাখিব প্রমোদে ভরি দিবানিশি মনপ্রাণ।
আন্ তবে বীণা--
সপ্তম সুরে বাঁধ্ তবে তান॥
ঢালো ঢালো শশধর, ঢালো ঢালো জোছনা।
সমীরণ, বহে যা রে ফুলে ফুলে ঢলি ঢলি।
উলসিত তটিনী,
উথলিত গীতরবে খুলে দে রে মনপ্রাণ॥
--- এই সহভাগিতার গানই হোক আমাদের আগামী পথচলার প্রেরণা। “সহযোগিতাই সমবৃদ্ধির চাবিকাঠি”।
০৫/০৭/২০২৫
*****
তথ্যসূত্র (References):
1. International Co-operative Alliance (ICA) Official Website:
https://www.ica.coop/en
2. United Nations — International Day of Cooperatives:
https://www.un.org/en/observances/cooperatives-day
3. International Labour Organization (ILO) — Cooperatives Unit:
https://www.ilo.org/global/topics/cooperatives/lang--en/index.htm
4. Rochdale Pioneers Museum (Co-operative Heritage Trust, UK):
https://www.rochdalepioneersmuseum.coop/
5. Government of India — National Cooperative Development Corporation (NCDC):
https://www.ncdc.in/
6. Amul India (Gujarat Cooperative Milk Marketing Federation):
https://amul.com/
7. Indian Farmers Fertiliser Cooperative Limited (IFFCO):
https://www.iffco.in/
8. Self Employed Women’s Association (SEWA):
https://www.sewa.org/
9. Grameen Bank, Bangladesh:
https://www.grameen.com/
10. BRAC Bangladesh:
https://www.brac.net/
11. International Journal of Rural Management – “Cooperatives in South Asia: Challenges and Prospects”
12. Rabindranath Tagore’s writings on rural reconstruction:
Tagore, R. (1928). Letters to Rathindranath, Palli Prakriti, Palli Samaj
(Collected in “Rabindra Rachanabali”, Vol. 22, Visva-Bharati Publications)
13. Tagore, R. (Selected Songs and Poems) — Sanchayita, Visva-Bharati
14. Bangladesh Department of Cooperatives (Govt. of Bangladesh):
https://www.coop.gov.bd/
15. Cooperative Development Foundation (India):
https://cdf-india.org/

No comments:
Post a Comment