An Undisputed Journalist: Aruna Asaf Ali

এক অবিসংবাদিত সাংবাদিক:- অরুণা আসফ আলী

Guest Column

Buddhadeb Gorai

Source: Online
Aruna Asaf Ali (née Ganguly) (16 July 1909 – 29 July 1996) was an Indian educator, political activist, and publisher. An active participant in the Indian independence movement, she is widely remembered for hoisting the Indian National flag at the Gowalia Tank maidan, Bombay during the Quit India Movement in 1942. Post-independence, she remained active in politics, becoming Delhi's first Mayor.

আজ ২৯ জুলাই—ভারতীয় ইতিহাসের এক অনন্য নারী, এক দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা, নির্ভীক সমাজচিন্তক ও সাংবাদিকতার জ্যোতির্ময় প্রতীক অরুণা আসফ আলীর মৃত্যুদিন । তিনি শুধু ইতিহাসের পাতায় একটি নাম নন, তিনি ছিলেন বিপ্লবের কণ্ঠস্বর, চিন্তার শক্তি এবং সত্যের অবিচল আশ্রয়। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং নারীর নীরবতা ভাঙার বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিবাদ।

১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে তিনি যখন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন—তখন তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত সাহসই ভারতীয় নারীর আত্মজাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। আবার স্বাধীনতার পর তিনি সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করে দেখিয়ে দিলেন—কলমও হতে পারে এক বিপ্লবী অস্ত্র।

 সংক্ষিপ্ত জীবনী

অরুণা আসফ আলী (১৬ জুলাই, ১৯০৯ – ২৯ জুলাই, ১৯৯৬) ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেত্রী, সাংবাদিক, শিক্ষিকা ও সমাজতন্ত্রী চিন্তাবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল অরুণা গাঙ্গুলী। তিনি পাঞ্জাবের কালকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। লাহোরের সেক্রেড হার্ট কনভেন্ট ও নৈনিতালের অল সেন্টস কলেজ থেকে শিক্ষালাভ করেন এবং পরে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯২৮ সালে কংগ্রেস নেতা আসফ আলীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যা ছিল সেই সময়ের প্রথাগত সমাজের বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ। তিনি ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেন এবং তিহার জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের অবস্থার বিরুদ্ধে অনশন করেন।

১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (Quit India Movement) তিনি গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে দেশজুড়ে বিক্ষোভের অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে সমাজতান্ত্রিক ও বাম রাজনীতির ধারায় যুক্ত হন।

তিনি ছিলেন দিল্লির প্রথম মহিলা মেয়র (১৯৫৮) এবং প্রতিষ্ঠা করেন দুইটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র—The Patriot ও Link।

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন:

পদ্মবিভূষণ (১৯৯২)

ভারতরত্ন (মরণোত্তর, ১৯৯৭)

লেনিন শান্তি পুরস্কার (১৯৬৪)

 সাংবাদিকতায় অরুণা আসফ আলীর ভূমিকা

অরুণা আসফ আলীর সাংবাদিকতা ছিল চেতনা ও ন্যায়ের সংগ্রাম। সংবাদপত্র তাঁর কাছে ছিল অস্ত্র ও প্রতিরোধের ভাষা। ১৯৪৭-এর পরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যখন রাষ্ট্রীয় ও কর্পোরেট প্রভাবের মুখোমুখি, তখন তিনি সংবাদপত্রকে করেছিলেন বিকল্প রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘Patriot’ ও ‘Link’ কেবল কংগ্রেসপন্থী মুখপত্র ছিল না, বরং শ্রমিক, কৃষক, নারীর অধিকার ও আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধ ছিল।

তিনি কখনো দলীয় চাপে মাথা নত করেননি, বরং সত্য ও মানবিক নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

 তাঁর সাংবাদিকতার চারটি মূল বৈশিষ্ট্য

১. বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ –

অরুণা আসফ আলীর সাংবাদিকতা কখনোই জল্পনা-কল্পনার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল না। তিনি প্রতিটি তথ্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে, তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর লেখায় ছিল যুক্তির নির্মোহ শাণ ও সত্যান্বেষণের স্পষ্টতা।

২. নৈতিক সাহস –

তিনি ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি কখনো প্রভাবশালী শক্তির সামনে মাথা নত করেননি। রাষ্ট্রের অন্যায় নীতি কিংবা দলের ভুল সিদ্ধান্ত— সব কিছুর বিরুদ্ধেই তিনি কলম ধরেছেন। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল বিবেক ও ন্যায়ের প্রতি অটল অঙ্গীকার।

৩. জনমত গঠনের কুশলতা –

শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন পাঠকের চিন্তাকে উদ্বুদ্ধ করাই সাংবাদিকতার প্রধান দায়িত্ব। অবহেলিত, প্রান্তিক, নির্যাতিত মানুষের কথা তুলে ধরে তিনি সমাজে সচেতনতা গড়ে তুলতেন এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতেন।

৪. নারী নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা –

একজন নারী হিসেবে তিনি সাংবাদিকতার যে মঞ্চ তৈরি করেছিলেন, তা ছিল নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নেতৃত্বের এক দীপ্ত প্রতীক। অরুণা আসফ আলী নারীর কণ্ঠকে মূলস্রোতের সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠা দিয়ে যান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক সাহসী দিশা রেখে।

নারী ও সাংবাদিকতা: চিন্তার স্বাধীনতায় প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর

অরুণা আসফ আলী বিশ্বাস করতেন—

 “নারীর মুক্তি কেবল ভোটাধিকার নয়, তা চিন্তার স্বাধিকার, ভাষার অধিকার ও প্রতিবাদের সাহসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।” তাঁর মতে, সংবাদপত্র কেবল তথ্যের বাহক নয়, বরং তা হতে পারে এক বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা, যেখানে নারীর নিজের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। তিনি নারীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন কলমকে করে তুলতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অস্ত্র। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল শুধুই তথ্য পরিবেশন নয়, বরং নারীজগৎ থেকে উৎসারিত সত্য, অনুভব ও প্রতিবাদের সুনির্দিষ্ট রূপ। এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই তিনি নারীর সাংবাদিকতা চর্চাকে শুধু অনুপ্রেরণামূলক নয়, চিন্তার মুক্তির বিপ্লবে পরিণত করেছিলেন।

উপসংহার

অরুণা আসফ আলী ছিলেন কেবল একজন সাহসিনী স্বাধীনতা সংগ্রামী নন—তিনি ছিলেন ভারতীয় সাংবাদিকতার এক চিরজাগরূক বিবেক। তাঁর কলম ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক প্রখর প্রতিবাদ, এবং তাঁর সাংবাদিকতা ছিল ন্যায়ের পক্ষে এক নিরলস অঙ্গীকার। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—সাংবাদিকতা শুধুমাত্র খবরের ভাষ্য নয়, তা এক নৈতিক চেতনার প্রতিচ্ছবি, যেখানে তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় দায়বদ্ধতা, এবং মতামতের সঙ্গে যুক্ত হয় মনুষ্যত্ব। আজকের তথাকথিত "বাজারমুখী" ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সংবাদ পরিবেশে, অরুণা আসফ আলীর জীবন ও কর্ম যেন এক দীপ্ত মাইলফলক। তাঁর আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি সত্য বলার সাহসে নিহিত।” সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড—এবং অরুণা আসফ আলী ছিলেন সেই মেরুদণ্ডের এক অবিচল স্তম্ভ। এই কারণেই ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করে কেবল একজন বিপ্লবী নারীনেত্রী হিসেবে নয়, বরং—“এক অবিসংবাদিত সাংবাদিক: অরুণা আসফ আলী”—এই শ্রদ্ধার্ঘ্যে অমর হয়ে আছেন তিনি।

------


Core Truths About the Traits of Good Leaders

 Guest Column

by

Col (Dr) Shantonu Roy

Life Skill Coach and Defence Analyst

Pexels


We have been talking about Leadership and the various traits of a good leader and the role of leadership from times immemorable. There are various qualities of leadership which hone skills of the team of the leader to achieve the target. Here are some core tenets about good leaders and effective leadership.

Good leaders are made, not born
First, we believe that leaders are trained, not born. Leadership is a skill that can be developed. Good leaders are molded through experience, continued study, intentional effort, and adaptation and professionalism. So, you can strengthen any of the characteristics of a good leader, if you are open to growth, and use your experiences to fuel development, and put in the time and effort toward self-improvement. With dedication, we can hone these top leadership qualities by ample opportunities for training, offering support for learning from challenges, and providing access to coaching and mentoring programs at regular intervals.

Leadership is a Social Process
It is also essential to recognize that leadership is less about one strong or charismatic individual, and more about a group of people working collectively to achieve results together. If you demonstrate several of these characteristics of a good leader, but fail to grasp this main point, chances are you will not get very far alone. You may be popular and held in high esteem, but it will be difficult to accomplish team or organizational goals. So, it is important to say that the results of leadership are about giving direction, alignment, and commitment to a group or teamwork is the name of the game. The talk should be about “WE” and not “ I”.

Pexels

Good Leadership never stops
Also, we believe that leadership is not a destination, it is a journey — it is something that you will have to strive regularly throughout your journey of life, regardless of the level you reach in your life or what industry you work in. Different teams, projects, and situations will provide different challenges and require different leadership qualities and competencies to succeed. So, you will need to be able to continue to apply these leadership characteristics in different ways throughout your career. Just continually keep learning and growing, and you’ll be an agile learner who is successful.

How to Develop and Nurture the Qualities of a Good Leader
Teamwork and organizational training can strengthen leadership qualities and foster deeper levels of engagement at work through providing a variety of on-the-job learning experiences, mentoring, and formal development opportunities. 

Leaders instill in their people a hope for success and a belief in them. Positive leaders empower people to accomplish their goals. Lastly, a leader with a vision is a powerful leader as they work to achieve their vision.

Different people have different views of the key leadership skills a leader should possess and it may take forever discussing all of them. The ones highlighted above are very important and have put some of the greatest leaders in the limelight.


 

গুরু পূর্ণিমা: এক প্রজ্ঞার উৎসব

 - Celebration of Guru Purnima -

Guest Column

 Buddhadeb Gorai

Assistant Professor

Deshbandhu College for Girls

Pexels

ভূমিকা

“গুরুব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”

ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ‘গুরু’ শব্দটি কেবল শিক্ষক বা জ্ঞানদাতার পরিচয় নয়; বরং তিনি সেই আলোকিত সত্তা, যিনি অজ্ঞতার ঘনঘোরে জ্বালিয়ে দেন চেতনার দীপ্ত শিখা। বাহ্যজ্ঞান নয়, তিনি অন্তর্জ্ঞানের দিশারি—আত্ম-উন্মোচনের কর্ণধার। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত ‘গুরু পূর্ণিমা’ এটি গুরু-শিষ্য সম্পর্কের চিরন্তন চেতনার এক প্রজ্জ্বলিত অনুরণন, যেখানে প্রণতি রূপ নেয় প্রজ্ঞার দ্বাররক্ষী, আর শ্রদ্ধা হয়ে ওঠে আত্মসন্ধানের একাগ্র সংকল্প।

এই পবিত্র দিনটি শুধুই আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর নয়, বরং এটি এক আত্মশুদ্ধির ব্রত, এক অন্তর্জাগরণের তপস্যা। এর উৎস নিহিত রয়েছে ঋগ্বেদ, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা, যোগশাস্ত্র, তন্ত্র ও স্মৃতিগ্রন্থসমূহের অন্তঃস্থলে—যেখানে গুরু হয়ে ওঠেন মানবিক সম্ভাবনার সর্বোচ্চ প্রকাশ।

‘গুরু’ কে?

‘গুরু’ শব্দটি কেবল একটি সম্বোধন নয়—এটি এক বহুরূপী জীবনদর্শনের প্রতীক। সংস্কৃত ব্যুৎপত্তিতে—

“গুঃ অন্ধকারং, রুঃ নাশকঃ।
গুরুঃ অন্ধকারনাশকঃ।”

— স্কন্দ পুরাণ

অর্থাৎ ‘গু’ মানে অন্ধকার, ‘রু’ মানে সেই শক্তি যা অন্ধকার বিনাশ করে। গুরু সেই ব্যক্তি যিনি অবিদ্যার অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের দীপ্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে গুরুতত্ত্ব কেবল ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। গুরু হলেন সেই সত্তা, যিনি নিজের আত্মপ্রকাশকে শিষ্যের অন্তরলোকে জাগিয়ে দেন। তিনি নিঃস্বার্থ, আত্মজ্ঞ, আলোকসম্পন্ন; নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যকে জ্ঞানের দীপ্তিময় পথে চালিত করেন।

মুন্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে—
“তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেত্
সমিত্পাণিঃ শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্।”

(মুন্ডক উপনিষদ ১.২.১২)

অর্থাৎ আত্মতত্ত্ব বা ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য সেই শিষ্যকে গুরুর শরণ নিতে হবে, যিনি শ্রোত্রিয় (শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন) ও ব্রহ্মনিষ্ঠ (আত্মসন্ধানে স্থিত)।

এই গুরু কেবল তথ্যদাতা নন, তিনি শিষ্যের চেতনার গভীরে জ্ঞানের দীপ জ্বালিয়ে দেন। তাই গুরু হচ্ছেন—
 
জ্ঞানের বাহক,
 
তত্ত্বের রক্ষক,
 
চেতনার জাগরণকারী।

তিনি শিষ্যকে আলোর পথে, অমৃতের পথে—‘অসতো মা সদ্ গময়’—নিয়ে যান।

ব্যাসদেব ও গুরু পূর্ণিমার ঐতিহাসিক শিকড়

গুরু পূর্ণিমার প্রাচীন রূপ 'ব্যাস পূর্ণিমা'— যা ভারতীয় জ্ঞানধারা ও সাহিত্যের অন্তঃস্থ কেন্দ্রে রচিত এক শ্রদ্ধার প্রস্তাবনা। এই দিনে আমরা স্মরণ করি সেই অসাধারণ ঋষিকে—মহর্ষি বেদব্যাস—যিনি জ্ঞানকে কেবল ধারণ করেননি, বরং তাকে সংহত করে লোকজ উপলব্ধির উপযোগী করে তুলেছেন।

বেদব্যাস—কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন—ছিলেন পরাশর ঋষি ও সত্যবতীর পুত্র।
তাঁর কীর্তিসমূহঃ
চার বেদের সংকলন,
ব্রহ্মসূত্র রচনা,
মহাভারতের মহাকাব্য সৃজন,
ঊনিশটি পুরাণ ও উপপুরাণের সংকলন।

এই আষাঢ়ী পূর্ণিমাতেই তাঁর জন্ম হয়েছিল বলে শাস্ত্রমতে বিশ্বাস। সেই কারণে শিষ্যসমাজ এ দিন ব্যাসদেবকে গুরুপরম্পরার আদিগুরু হিসেবে পূজা করে। সময়ের সঙ্গে ব্যাস পূর্ণিমা রূপান্তরিত হয় গুরু পূর্ণিমায়—যেখানে ব্যাসদেব হয়ে ওঠেন সমস্ত গুরু-তত্ত্বের উৎসস্থল।

গুরু-শিষ্য সম্পর্কের গূঢ়তা

ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্ক কেবল জ্ঞান-বিনিময়ের নয়—এটি আত্মা ও চৈতন্যের এক দীক্ষিত সংলাপ।

এই সম্পর্ক তিনটি স্তম্ভে স্থাপিত—
প্রণিপাত (বিনম্র আত্মসমর্পণ),
পরিপ্রশ্ন (সতত অন্বেষা),
সেবা (নির্বিচার নিষ্ঠা)।

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় (৪.৩৪) বলা হয়েছে—
“তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদীক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ॥”

অর্থাৎ, সত্যদ্রষ্টা গুরুর নিকট যেতে হবে প্রণতিসহকারে, শ্রদ্ধাসহকারে প্রশ্ন করে, সেবার মাধ্যমে নিবেদন জানিয়ে—তাহলেই তিনি তত্ত্বজ্ঞান দান করবেন।

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ভাষায়—
“যস্য দেৱে পরা ভক্তিঃ তথা দেৱে তথা গুরৌ।
তস্যৈতে কথিতা হ্যর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ॥”

— শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬.২৩

অর্থাৎ, যাঁর ঈশ্বর ও গুরুর প্রতি সমান ভক্তি রয়েছে, তিনিই প্রকৃত শাস্ত্রজ্ঞানের অধিকারী।

এই শ্লোকগুলি গুরু-শিষ্য সম্পর্কের দার্শনিক গভীরতা উন্মোচন করে—গুরু কেবল শিক্ষক নন, ঈশ্বরপ্রতিম তত্ত্বদ্রষ্টা, যাঁর কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ মানে আত্মদীক্ষা ও চেতনার বিবর্তন।

গুরুকুল থেকে শাস্ত্রীয় গুরুতত্ত্ব

ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা—গুরুকুল—ছিল কেবল বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্র নয়; এটি ছিল আত্মশিক্ষার এক অভিন্ন, ধ্যানমগ্ন ক্ষেত্র, যেখানে শিক্ষা মানে ছিল চরিত্রগঠন, আত্মশাসন ও চেতনার প্রসার। এখানে শিক্ষা ছিল সহাবস্থানমূলক—গুরুর সান্নিধ্যে, তাঁর প্রতিদিনের জীবনের মধ্য দিয়ে, ধ্যান-সেবা-সংযমের ধারায়।

এই ধারায় গুরু কেবল জ্ঞানদাতা নন, তিনি ছিলেন আত্মিক জীবনের আদর্শ, দেহ ও মনের সাধনার পথপ্রদর্শক। উপনিষদের ভাষায়—
“আচার্যবান্ পুরুষো বেদ।”
— ছান্দোগ্য উপনিষদ (৬.১৪.২)

অর্থাৎ, যাঁর জীবনে আচার্য বা গুরু আছেন, তিনিই প্রকৃতভাবে জ্ঞান উপলব্ধি করতে সক্ষম।

শিব-পার্বতীর সংলাপে সংকলিত স্কন্দ পুরাণের ‘শ্রীগুরু গীতা’-য় গুরুতত্ত্বকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক সর্বব্যাপী, ঐশ্বরিক মহাশক্তি হিসেবে—
“গুরুর্ ব্রহ্মা গুরুর্ বিষ্ণুঃ গুরুর্ দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”

এটি কেবল এক স্তোত্র নয়—গুরুর আত্মিক অবস্থানের স্বীকৃতি। গুরু কেবল জ্ঞান জানেন না—তিনি নিজেই জ্ঞানতত্ত্বরূপ।

গুরুকুল প্রথায় এই গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ছিল একেবারে ঘনিষ্ঠ ও সহজ। শিষ্য কেবল পাঠ্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, গুরুর আচরণে, বাক্যে, নীরবতায় শিক্ষালাভ করত। এই শিক্ষা ছিল অ-পরীক্ষানির্ভর, অ-পাঠ্যসূচিবদ্ধ; এটি ছিল এক অন্তর্জ্ঞানময়, ব্যতিক্রমী জীবনযাত্রার সাধনা।

যোগ-তন্ত্রে গুরু

যোগ ও তন্ত্র—এই দুই সাধনাপথে গুরু হয়ে ওঠেন কেবল নির্দেশক নন, তিনি নিজেই সেই চেতনার উৎস, যার থেকে আত্মোদ্ভব ঘটে।

যোগসূত্রে পতঞ্জলি বলেন—
“স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেনানবচ্ছেদাৎ॥”
— যোগসূত্র ১.২৬

অর্থাৎ, ঈশ্বরই আদিগুরু, যিনি কালের সীমা ছাড়িয়ে চিরন্তনভাবে সমস্ত ঋষি ও যোগীর হৃদয়ে চৈতন্যরূপে বর্তমান। এই ঈশ্বর-গুরু—নিঃশব্দ, কিন্তু সর্বত্র গূঢ়, অন্তর্জ্ঞানে দীপ্ত।

তন্ত্রশাস্ত্রে গুরু হলেন মন্ত্রদাতা, দীক্ষাগুরু, শক্তিপ্রবর্তক। তিনি কেবল তত্ত্ব শেখান না; বরং কুণ্ডলিনী জাগরণের মধ্য দিয়ে শিষ্যের আত্মবোধ ও রূপান্তরের সূচনা করেন।

“গুরুং বিনা ন সিদ্ধিঃ স্যাৎ সর্বত্র নাত্র সংশয়ঃ॥”
— তন্ত্রসার

অর্থাৎ, গুরুর অনুগ্রহ ব্যতীত আধ্যাত্মিক সিদ্ধি সম্ভব নয়। কারণ তন্ত্রে জ্ঞান হল চৈতন্য-প্রবাহ—যা কেবল দীক্ষার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।

শ্রীগুরু গীতায় বলা হয়—
“ন গুরুঃ ন পিতা মাতা, ন বন্ধুঃ ন পতিস্তথা।
যঃ সত্যং ব্ৰুহতি প্রীত্যা, স গুরুঃ সত্যদর্শিনঃ॥”

— শ্রীগুরু গীতা

অর্থাৎ, যিনি হৃদয় থেকে সত্য উপলব্ধি করেন এবং তা স্নেহসহকারে প্রকাশ করেন—তিনিই প্রকৃত সত্যদর্শী গুরু, পিতা, মাতা, বন্ধু বা পতিও সেই গুরুতুল্য নন।

যোগ ও তন্ত্র উভয় ধারায় গুরু দীক্ষাদাতা, চেতনা-উন্মোচক এবং মোক্ষের সহযাত্রী। তিনি কেবল দিগ্দর্শক নন—তিনি নিজেই পথ, তিনি নিজেই গন্তব্য।

গুরু পূর্ণিমার আচরণ ও প্রথা: বাহ্য আচার থেকে অন্তর্নিহিত আত্মশুদ্ধি

গুরু পূর্ণিমা কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস নয়—এটি এক নিঃশব্দ আত্মনিবেদনের মুহূর্ত, যেখানে বাহ্যিক প্রণতি রূপ নেয় অন্তরের আত্মসমর্পণে।

এই দিনে ফল, পুষ্প, দীক্ষাদক্ষিণা ইত্যাদি উপাচার কেবল উপহার নয়—এগুলি অন্তরের কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

গুরুস্তোত্র পাঠ, গুরুপরম্পরার শ্রবণ, ও গুরু-চরণে ধ্যান—এই সবকিছু শিষ্যকে স্মরণ করায়, তিনি কার আশ্রয়ে চলেছেন, এবং তাঁর চৈতন্য কোথায় নিবদ্ধ।

“নাভিবাদয়েত্ গুরুং, ন নমন্তি সদা গুরুং।
যত্র কুত্র ন তিষ্ঠন্তি, গুরুঃ সর্বত্র সর্বদা॥”

— স্মৃতিশাস্ত্র

অর্থাৎ, গুরু কেবল বাহ্যিক সত্তা নন—তিনি সর্বত্র, চেতনার প্রতিটি স্তরে, চিরকাল বর্তমান।

এই উপলব্ধিই গুরু পূর্ণিমার অন্তর্নিহিত সাধনা—যেখানে প্রণতি মানে আত্মদীক্ষা, আর বাহ্য আচরণ রূপ নেয় চৈতন্যানুশীলনে।

এই দিনটি হয়ে ওঠে—
আত্মস্মরণের নিঃশব্দ প্রহর,
শিষ্যত্বের গভীর প্রতিজ্ঞা,
এবং গুরুতত্ত্বের অন্তর্জ্যোতির আবাহন।

উপসংহার

গুরু পূর্ণিমা নিছক কোনও পূজা বা আচারানুষ্ঠান নয়—এটি এক আত্মদীক্ষার উজ্জ্বল প্রহর, আত্মসংশোধনের এক নিরব তপস্যা, যার অন্তরালে জ্বলজ্বল করে চৈতন্যের অনন্ত দীপশিখা।

অর্থাৎ, এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—গুরু হলেন সেই,
“যিনি আমাদের কী ভাবতে হবে তা শেখান না, বরং কীভাবে ভাবতে হয়, তা জাগিয়ে তোলেন।”
তাঁর আশ্রয়ে জ্ঞান হয়ে ওঠে অন্তর্জ্ঞান, শিক্ষা রূপ নেয় সাধনায়, আর প্রণতি পরিণত হয় অন্তরের নিবেদনে।

গুরুস্তোত্রে বলা হয়েছে—
“অজ্ঞানতমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥”

অর্থাৎ, “যিনি জ্ঞানের অঞ্জন দ্বারা অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে নয়ন খুলে দেন—তাঁকে আমি প্রণাম করি।”

এই এক পংক্তিতে গুরুতত্ত্বের সারমর্ম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গুরু হলেন সেই—
যিনি অন্ধতার ঘন অরণ্যে জ্বালিয়ে দেন চেতনার দীপ,
যিনি প্রজ্ঞার অঞ্জনে খুলে দেন অন্তর্দৃষ্টি,
যিনি শিষ্যের বুকে জাগিয়ে তোলেন আত্মসন্ধানের পবিত্র আকাঙ্ক্ষা।

গুরু পূর্ণিমা তাই শুধুই একটি উৎসব নয়—এটি চেতনার দীপ্ত জাগরণ। এই দিনে আমরা প্রণতি জানাই এমন এক পথপ্রদর্শককে, যিনি কেবল বাহিরের আলোক নন—তিনি হৃদয়ের অন্তরতম স্থানে জ্বলে থাকা এক শাশ্বত প্রদীপ।

আজকের দিনে, আসুন আমরা কেবল গুরুর চরণে নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে, জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে স্থাপন করি সেই গুরুতত্ত্বকে—

যিনি সময়ের স্রোতে চেতনার পাথেয়,
যিনি প্রজ্ঞার আলোক,
যিনি আত্মজ্ঞানের মৌন মূর্তী
যিনি আমাদের চালনা করেন সত্যের দিকে।

 

---------

 

NATIONAL PR DAY celebrated by the PRSI, Kolkata Chapter

by

Moumita De Das

Associate Professor & ASCOPE Editor

Amity School of Communication, Kolkata

The event poster

Amity University conferred the Institutional Distinction for Media Education 
by PRSI, Kolkata Chapter

This is a moment of joy for Amity University Kolkata


On 22nd April, 2025, the Public Relations Society of India (PRSI), Kolkata Chapter conferred Amity School of Communication (ASCO-KOL) the Institutional Distinction for imparting the Media Education in West Bengal!

Our student Shreya Kumari from M.A PR received her medal and the certificate
for being PR Topper

Other Student Toppers

The annual programme which marked the celebration of the National Public Relations Day also recognised the PR Toppers from the prestigious media institutes in the state of West Bengal. Our student, Shreya Kumari from M.A PR  received her medal and the certificate.

The evening well spent with the keynote address on AI and the responsible usage by the Principal of Dr. B.C. Roy Engineering College, Durgapur, Dr. Sanjay S. Pawar.

The event was held at Balmer Lawrie Training Centre. We are grateful to Shri Soumyajit Mahapatra, Chairman, PRSI, Kolkata Chapter for organising such eventful programme and conferring Amity University.

The media fraternity of Kolkata





Relationship Gyan by Moumita De Das


Dil toh hai dil.... Aahista Aahista...

 Raat baaki,baat baaki  Tanhayeen...

 Kya gham hai...

    Khush raho, abaad raho, dil mein raho ya na raho...
















আজ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস

Guest Column

(International Day of Cooperatives)

by

Buddhadeb Gorai

Assistant Professor in Philosophy, Deshbandhu College for Girls, Calcutta University

Pexels

ভূমিকা

"সহযোগেই মানুষের মুক্তি, প্রতিযোগে নয়।"— মহামানব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৫ জুলাই (শনিবার) ২০২৫—একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যেদিন বিশ্বমঞ্চে উদ্‌যাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস (International Day of Cooperatives)। এ দিনটি যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজ বিনির্মাণের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে একক প্রয়াসের নয়, বরং সমবেত উদ্যোগের মধ্যে।

যেখানে প্রতিযোগিতার দৌড়ে মানুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, সেখানে সমবায় চেতনা মানুষকে করে তোলে পরস্পরের সহযাত্রী। ব্যক্তি-নির্ভর পুঁজিবাদী উন্নয়নের জোয়ারে যখন সমাজ প্লাবিত, তখন এই দিবস এক বিকল্প আলোকবর্তিকা নিয়ে আসে—যেখানে সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব এবং সমানাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এক সহমর্মী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের রূপরেখা।এই দিনটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়—এ যেন এক মূল্যবোধের অনুশীলন, এক সামাজিক ও নৈতিক আহ্বান:--“তুমি একা নও, একসাথে পথ হোক উত্তরণের।”

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস তাই আমাদের কাছে কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ—যা উন্নয়নকে অর্থের বিচারে নয়, মানবিকতা ও সংহতির পরিমাপে বিচার করে।

দিবসটির সূচনা ও স্বীকৃতি

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের শিকড় নিহিত রয়েছে উনিশ শতকের সমাজ পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। ১৮৪৪ সালে, ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার অঞ্চলের রোচডেল শহরে একদল বুননশিল্পী শ্রমিক গড়ে তোলেন “Rochdale Society of Equitable Pioneers” নামক একটি সমবায় সংস্থা। এটি ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায্য বণ্টনের লক্ষ্যে পরিচালিত প্রথম আধুনিক ও সংগঠিত সমবায় উদ্যোগ। এই সংস্থাই “Rochdale Principles” নামে পরিচিত সমবায়ের সাতটি মৌলিক নীতি রূপ দেয়, যা আজও বিশ্বের সমবায় কাঠামোর ভিত্তি।

এরপর সময়ের পরিক্রমায়, ১৮৯৫ সালে গঠিত হয় International Co-operative Alliance (ICA)—যা বিশ্বব্যাপী সমবায় আন্দোলনের ছাতাসংগঠন। ICA ১৯২৩ সাল থেকে প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস পালন শুরু করে, যাতে বিশ্ববাসী সমবায়ের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারে।

১৯৯২ সালে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ICA-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালে—যা ছিল ICA-এর শতবর্ষপূর্তি বছর—থেকে দিবসটি জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসটি জাতিসংঘের “সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (SDGs)” এর সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত, বিশেষত দারিদ্র্য দূরীকরণ, লিঙ্গ-সমতা, ন্যায্য কর্মসংস্থান ও সুস্থায়ী সম্প্রদায় গঠনের লক্ষ্যে।আজ এই দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মারক নয়, বরং বিশ্বব্যাপী এক নৈতিক ও সামাজিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ—যেখানে ব্যক্তির থেকে গোষ্ঠী, প্রতিযোগিতার থেকে সহযোগ, এবং লাভের থেকে দায়িত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

 ২০২৫ সালের থিম--"Cooperatives: Building a Better Future for All"

 বাংলা অর্থ: “সমবায়: সবার জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক”

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের এই বার্তাটি নিছক একটি স্লোগান নয়; এটি এক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান, যা বর্তমান বৈষম্যপূর্ণ, সংকটপূর্ণ এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকটের প্রেক্ষিতে সমবায়ের ভূমিকাকে নতুন আলোয় তুলে ধরে।

এই থিমটি মূলত তিনটি মৌলিক বোধকে কেন্দ্রীভূত করে:

1. অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন (Inclusive Development):

যেখানে সবাই—নারী, শিশু, শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। সমবায় কাঠামো এই অন্তর্ভুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

2. মানবিক অর্থনীতি (Human-centered Economy):

সমবায়ের দর্শন লাভ নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন ও সম্মানকে প্রাধান্য দেয়। তাই এটি একটি "মানুষ-কেন্দ্রিক" বিকল্প অর্থনৈতিক পথ তৈরি করে, যা ব্যক্তিস্বার্থের উপরে গোষ্ঠীর মঙ্গলকে স্থান দেয়।

3. সুস্থায়ী ভবিষ্যৎ নির্মাণ (Sustainable Future):

জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতা—এই সংকটগুলো মোকাবিলায় সমবায় একটি ন্যায্য ও সহনশীল কাঠামো প্রদান করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান রক্ষায় সহায়ক।

এই থিমের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—সমবায় শুধু উৎপাদনের একটি ব্যবস্থা নয়, এটি সমাজ বিনির্মাণের এক নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি।এটি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে জিজ্ঞাসা তোলে—“উন্নয়ন কার জন্য? উন্নয়ন কাদের সঙ্গে নিয়ে?”

আন্তর্জাতিক সমবায় সংঘ (ICA) এই থিমের আওতায় ২০২৫ সালে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে—

 1. নারীদের নেতৃত্বে সমবায়

 2. যুবসমাজের অংশগ্রহণ

 3. ডিজিটাল ও সবুজ সমবায় উদ্যোগ

 4. স্থানীয় সম্পদের উপর ভিত্তি করে সুস্থায়ী কর্মসংস্থান

এইভাবে, ২০২৫ সালের থিমটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—সহযোগ, সমতা ও সংহতির ভিত্তিতে গড়ে উঠুক এমন এক বিশ্ব, যেখানে উন্নয়ন কারো একার সম্পদ নয়—বরং সবার অধিকার।

সমবায়ের মৌলিক নীতি: “Rochdale Principles”

১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রোচডেল শহরে গঠিত “Rochdale Society of Equitable Pioneers” আধুনিক সমবায় আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। এই সংগঠনটি সমবায় পরিচালনার জন্য যে সাতটি নৈতিক ও কার্যকর নীতি নির্ধারণ করেছিল, তা পরবর্তীতে “Rochdale Principles” নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়।

এই সাতটি নীতি শুধু ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম নয়, বরং একটি মানবিক ও ন্যায্য সমাজ গঠনের রূপরেখা:

1. গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ (Democratic Member Control):

সমবায়ে প্রত্যেক সদস্যের সমান অধিকার থাকে। “এক সদস্য, এক ভোট” নীতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়—চাই সে যত বড় বিনিয়োগকারী হোক বা ছোট। এটি সমবায়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিশ্চিত করে।

2. অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (Member Economic Participation):

সদস্যরা সমবায়ে পুঁজি বিনিয়োগ করেন এবং লাভের ন্যায্য অংশ পান। লাভের বিতরণ করা হয় সদস্যদের ব্যবহারের পরিমাণ অনুসারে, কেবল মূলধনের অনুপাতে নয়—এটাই মূল পার্থক্য পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

3. স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা (Autonomy and Independence):

সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের সদস্যদের দ্বারা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। কোনো সরকারি বা বেসরকারি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের স্বার্থে কাজ করে।

4. শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্য (Education, Training and Information):

সদস্যদের সচেতন ও সক্ষম করে তুলতে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে সমবায়ের চেতনা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জানানো হয়।

5. পরস্পর সহযোগিতা (Cooperation among Cooperatives):

সমবায় সংস্থাগুলি পরস্পরের সঙ্গে ন্যায্য ও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় যুক্ত থাকে—স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। এতে একটি বৃহত্তর সমবায় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

6. সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব (Concern for Community):

সমবায় শুধু সদস্যদের স্বার্থে নয়, বৃহত্তর সমাজ ও পরিবেশের উন্নয়নেও দায়বদ্ধ। সামাজিক কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থিতিশীল সম্প্রদায় গঠনে সক্রিয় থাকে।

7. খোলা ও স্বেচ্ছামূলক সদস্যতা (Voluntary and Open Membership):

জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মত বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমবায়ে যোগ দেওয়ার অধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত—কোনো বৈষম্য বা শর্ত নেই।

এই নীতিমালাই সমবায়কে একটি সমাজ-নির্মাণকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যেখানে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায্যতা ও অংশীদারিত্ব মিলেমিশে গড়ে তোলে একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে

দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য পরস্পর মিশে রয়েছে, সেখানে সমবায় আন্দোলন শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ নয়—বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক ন্যায্যতা ও গ্রামীণ পুনর্গঠনের একটি কার্যকর হাতিয়ার।

 ভারত:

ভারতে সমবায় আন্দোলনের সূচনা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়, ১৯০৪ সালে গৃহীত "Co-operative Credit Societies Act" এর মাধ্যমে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের ঋণদাতা মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা করা। স্বাধীনতার পর এই আন্দোলন নতুন গতি পায় এবং রাষ্ট্রীয় স্তরে সমবায়কে "inclusive development"-এর অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।বিশ্বখ্যাত ‘আমুল’ (Amul)—একটি দুগ্ধ উৎপাদক সমবায়, যা ভারতে “সাদা বিপ্লব”-এর পথপ্রদর্শক।IFFCO (Indian Farmers Fertiliser Cooperative Limited)—বিশ্বের বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী সমবায়।SEWA (Self Employed Women’s Association)—নারী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে অনন্য মডেল।

বাংলাদেশ:

বাংলাদেশে সমবায় কাঠামো গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ডরূপে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪০-এর দশকে গঠিত বিভিন্ন কৃষি ও ঋণভিত্তিক সমবায় সমিতি পরবর্তীতে বিস্তৃত হয়ে জাতিগত, পেশাভিত্তিক এবং নারীভিত্তিক রূপ নেয়।বিশ্ববিখ্যাত গ্রামীণ ব্যাংক, যা মূলত ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সমবায় মডেল, দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।ব্র্যাক(BRAC)—একটি বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা, সমবায় চেতনার উপর ভিত্তি করেই গঠিত, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখছে।এছাড়াও কৃষিভিত্তিক সমিতি ও নারীকেন্দ্রিক সংস্থা গ্রামীণ পল্লিতে আত্মনির্ভরতার পথ তৈরি করছে।

 নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান:

এই দেশগুলোতেও সমবায় সংগঠনগুলো বিশেষ করে কৃষি, মৎস্যচাষ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও গ্রামীণ সঞ্চয় ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।নেপালে সমবায় সংস্থা “Sajha” একটি ঐতিহ্যবাহী উদ্যোগ।শ্রীলঙ্কায়“Sanasa” আন্দোলন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে।পাকিস্তানে Cooperative Housing Societies নগরায়ন ও বসতবাড়ি নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে সমবায় শুধুমাত্র একটি আর্থিক কাঠামো নয়—এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক পুনরুজ্জীবনের এক চলমান ধারাবাহিকতা, যেখানে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মানুষ নিজেই নিজের সমাজ গড়তে শেখে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সহযোগিতার দর্শন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু এক কবি, চিত্রশিল্পী বা সংগীতকার ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন সময়চেতন, মানবিক সমাজদার্শনিক। তাঁর সমাজচিন্তার কেন্দ্রে ছিল সহযোগের নৈতিকতা, যা শুধু সামাজিক ন্যায়ের প্রস্তাব নয়, বরং আত্মার মুক্তির এক পথনির্দেশ।

শান্তিনিকেতনের শিক্ষা-ভাবনা থেকে শুরু করে শ্রীনিকেতন প্রকল্প, গ্রামশিক্ষা কেন্দ্র, পল্লী সমিতি, এমনকি তাঁর “ব্রহ্মবিদ্যা” বিষয়ক চিন্তায়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি সমাজকে একটি জৈবিক ঐক্য হিসেবে দেখতেন, যেখানে মানুষের মুক্তি আসে সমবেত প্রয়াসের মাধ্যমে, একক ব্যক্তিচর্চার মাধ্যমে নয়।

তিনি গভীর উপলব্ধি থেকে বলেছিলেন—“যে আত্মাকে আমরা বিচ্ছিন্ন করি, সে আত্মা নয়; যে আত্মায় সমস্তকে ধরা যায়, সে-ই মুক্ত আত্মা।”

এই বক্তব্য কেবল ধর্মতাত্ত্বিক নয়, এটি এক সমষ্টিক সমাজচিন্তার মূলসূত্র। তাঁর মতে, মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে “আমি” থেকে “আমরা”-র দিকে অগ্রসর হয়।

শ্রীনিকেতনের "পল্লীসমিতি" ছিল একটি সামাজিক উদ্ভাবন, যেখানে কৃষক, কারিগর, শিক্ষক, এবং সংস্কৃতিকর্মীরা সমবেত হয়ে গড়ে তুলতেন অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, শিক্ষার প্রসার এবং সাংস্কৃতিক উন্মেষের এক সম্মিলিত চেতনা।

রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন—ভারতের পল্লীসমাজ কেবল অর্থনৈতিক অনটনে নয়, মনোবলহীনতা ও বিচ্ছিন্নতায় জর্জরিত। সেই সমাজকে জাগ্রত করতে হলে প্রয়োজন সহযোগের বন্ধন, যা দিয়ে মানুষ নিজেকে ও অপরকে বুঝতে শেখে।তিনি লিখেছিলেন:--- “সভ্যতা সেই এক, যেখানে আমরা অপরের আনন্দে আনন্দিত হই, অপরের কষ্টে কাতর হই।”এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসের মূল মর্মার্থের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুতরাং রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতার দর্শন কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং মনুষ্যত্বের স্বরূপ নির্ধারণ করে। সমবায় তাঁর চোখে ছিল একটি আত্মিক ও সামাজিক পরিপূর্ণতার পথ—যেখানে ব্যক্তির বিকাশ ঘটেছে সমাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে, না যে সমাজ থেকে পৃথক হয়ে।

আজকের প্রাসঙ্গিকতা

একবিংশ শতকের বিশ্ব আজ বহুবিধ সংকটে নিমজ্জিত—বৈষম্যের প্রসার, নিঃস্ব মানুষের হাহাকার, সীমাহীন ভোগের প্রবণতা, এবং ক্রমাগত প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের সভ্যতার ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্ধ প্রতিযোগিতা, লাভকেন্দ্রিক প্রবণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা যেন আমাদের আরও একাকী করে তুলেছে।এই প্রেক্ষাপটে, সমবায় কেবল একটি আর্থিক মডেল নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক দর্শন—যা আমাদের শেখায় কিভাবে আমরা 'আমি' থেকে 'আমরা' হয়ে উঠতে পারি।

সমবায়:

একদিকে যেমন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন, যেখানে পুঁজির আধিপত্য নয়, বরং অংশগ্রহণ ও সমবণ্টনের উপর ভিত্তি করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা হয়,

তেমনি এটি একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থায়ী কাঠামো, যেখানে প্রতিটি সদস্যের কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় স্বচ্ছতার সঙ্গে,

আবার এটি সর্বোপরি একটি মানবিক জীবনচর্চার প্রস্তাব—যেখানে পরার্থপরতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

আজকের বিশ্ব যদি টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে ফিরতে হবে এমন এক ব্যবস্থার দিকে, যেখানে উন্নয়ন মানে হবে কেবল মুনাফা নয়, সহাবস্থান, সম্মান ও সংহতির জয়।

যেখানে প্রতিটি গ্রামীণ কৃষক, শহরের শ্রমজীবী নারী, প্রান্তিক কিশোর কিংবা প্রবীণ নাগরিক—সকলেই হয়ে উঠবে সমাজগঠনের সক্রিয় অংশীদার। এই ভাবনাই আজকের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবসকে করে তোলে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

উপসংহার

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিবস কেবল একটি দিন নয়—এটি একটি চলমান সামাজিক-নৈতিক আন্দোলনের প্রতীক। এটি এমন এক মানবিক চেতনার নাম, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযাত্রী হয়ে ওঠে। যেখানে “আমি”-র জগৎ ছাপিয়ে মানুষ পৌঁছায় “আমরা”-র বৃহত্তর বোধে। সহযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল নয়—এটি এক বিকল্প সভ্যতার ভাষা, যেখানে সমতা, ন্যায়, সম্মান ও সৌহার্দ্য একত্রে বাস করে।

এই দিন আমাদের নতুন করে শিখিয়ে দেয়—সমাজ গঠনের প্রকৃত পথ প্রতিযোগিতার মরীচিকায় নয়, বরং সহযোগের বিশ্বাসে। তাই আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—“প্রতিযোগ নয়, সহযোগ-ই হোক আমাদের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।” এই ভাবনা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতেও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর গান আমাদের হৃদয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়:

আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি

নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।

আন্‌ তবে বীণা--

সপ্তম সুরে বাঁধ্‌ তবে তান॥

পাশরিব ভাবনা, পাশরিব যাতনা,

রাখিব প্রমোদে ভরি দিবানিশি মনপ্রাণ।

আন্‌ তবে বীণা--

সপ্তম সুরে বাঁধ্‌ তবে তান॥

ঢালো ঢালো শশধর, ঢালো ঢালো জোছনা।

সমীরণ, বহে যা রে ফুলে ফুলে ঢলি ঢলি।

উলসিত তটিনী,

উথলিত গীতরবে খুলে দে রে মনপ্রাণ॥

--- এই সহভাগিতার গানই হোক আমাদের আগামী পথচলার প্রেরণা। “সহযোগিতাই সমবৃদ্ধির চাবিকাঠি”।

০৫/০৭/২০২৫

*****

তথ্যসূত্র (References):

1. International Co-operative Alliance (ICA) Official Website:

 https://www.ica.coop/en

2. United Nations — International Day of Cooperatives:

 https://www.un.org/en/observances/cooperatives-day

3. International Labour Organization (ILO) — Cooperatives Unit:

 https://www.ilo.org/global/topics/cooperatives/lang--en/index.htm

4. Rochdale Pioneers Museum (Co-operative Heritage Trust, UK):

 https://www.rochdalepioneersmuseum.coop/

5. Government of India — National Cooperative Development Corporation (NCDC):

 https://www.ncdc.in/

6. Amul India (Gujarat Cooperative Milk Marketing Federation):

 https://amul.com/

7. Indian Farmers Fertiliser Cooperative Limited (IFFCO):

 https://www.iffco.in/

8. Self Employed Women’s Association (SEWA):

 https://www.sewa.org/

9. Grameen Bank, Bangladesh:

 https://www.grameen.com/

10. BRAC Bangladesh:

 https://www.brac.net/

11. International Journal of Rural Management – “Cooperatives in South Asia: Challenges and Prospects”

12. Rabindranath Tagore’s writings on rural reconstruction:

Tagore, R. (1928).  Letters to Rathindranath, Palli Prakriti, Palli Samaj

(Collected in “Rabindra Rachanabali”, Vol. 22, Visva-Bharati Publications) 

13. Tagore, R. (Selected Songs and Poems) — Sanchayita, Visva-Bharati

14. Bangladesh Department of Cooperatives (Govt. of Bangladesh):

 https://www.coop.gov.bd/

15. Cooperative Development Foundation (India):

 https://cdf-india.org/


চিরসখা

    A Short Bengali story

by

Rishita Ghosh 

Pexels

গল্পটা কিন্তু আজকের নয়। প্রায় তিনটে বছর হয় গালো, ওদের দেখাও হয়নি, কথা হয়নি আর কোন রকম কোন যোগযোগ ও নেই। ওথছ, কিছু বছর আগে অব্দি ও তারা একে ওপরকে ছারা থাকতেই পারতোনা। সময়, মানুষ কে অনেক কিছু বুঝতে শেখায়, মানুষ চিন্তে শেখায়, পরিস্থিতি ওনুজাই আচরন করতে শেখায়, কিন্তু আবার এই সময় ই মানুষকে তার জীবনের সব থেকে বড় ধাক্কা টা দেয়। অভিক আর অনন্যার গল্প টাও ওনেকটা সময়ের চাকায় বাধা।

 অভিক, উচ্চাকাঙ্ক্ষা না , তবে জীবনে যে একবরেই কিছু করার ইচ্ছা নেই, তেমন টাও না। তার স্বপ্ন গুলো খুব সীমাবদ্ধ। একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী বড়িতে যা হয় আরকি। বাবা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, বিনয় সেন। আর মা এখনো অবধি একটি কলেজ এ পড়ায়, তোবে যত দিন যাচ্ছে তার ও অবসরপ্রাপ্তির দিন আগিয়ে আসছে। বিনয় বাবু আর মালা দেবীর কুল তিনটি সন্তান, দুই ছেলে আর একটি মেয়ে : অভীক, অরূপ আর অপর্ণা। মেয়ে হলো একেবারে বাবার চোখের মণি, আর যত শাসন সব দুই ছেলের ওপর দিয়ে যায়। ছেলেদের জন্য বিনয় বাবু একজন অত্যন্ত কঠোর বাবা।

আবার উল্টো দিকে অনন্যা, একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী বাড়ি থেকে অন্তর্গত না করলেও, ওদের পরিবারকে দেখে বোঝাই যায়না যে ওরা যথেষ্ঠ বড়লোক। অনন্যার বাবা খুব নামি একজন ব্যবসায়ী, সমীর রায়। অনন্যা, বাবার একমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে অনেক আদরে আল্লাদেই ছোটো থেকে বড়ো হয়ছে। মেয়ে যা বলে, বাবা তাই এনে দেন। হ্যাঁ, তার মানে এই নয় যে অন্যায় আবদার গুলো ও মেনে নেন। যেখানে ভুল, সেখানে ঠিকই সে তার মেয়েকে বোকে শাসন করে আবার ঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন । অনন্যার যখন দশ বছর বয়স, তখন তাঁর মা, শ্রীপ্রণা রায়, একটি ব্রেইন টিউমার এ মারা জান। অনেকটাই ছোট হওয়ার কারণে, অনন্যার তার মায়ের স্মৃতি তেমন কিছুই মনেও নেই।

এইবার আসি অভিক আর অনন্যার কথায়। আসলে অনু আর অভিকের বাবা ছোটবেলা থেকেই একই সাথে বড় হয়েছে, একই স্কুল, একই পাড়া। সেই মতে, পারিবারিক বন্ধু হিশেবে ওরাও বন্ধু, কিন্তু ছোট বেলাতেই সমীর বাবু আর বিনয় বাবু চেয়েছিলেন জে তাদের ছেলেমেয়েরা ও তদের মত একসাথে বড়ো হোক। তাই দুজন কেই প্ল্যান করে একই স্কুলে এবং একই কলেজে পড়ান। কলেজে ডিপার্টমেন্ট আলদা হলেও, বিকেলে রাজু দার দোকানে বসে চা এর আড্ডা টা কিন্তু বাধ্যতামূলক, সে যতই ক্লাস আর এসাইনমেন্ট থাকুক না কেনো।  স্কুল জীবনে অভিক আর অনন্যা বেস্ট ফ্রেন্ডস ছিল, কলেজে ওঠার পড়েও তাই আছে। যত দিন গেছে, ওদের বন্ধুত্ব বেড়েছে বই কমেনি। কিন্তু, ওদের বাবারা শুধু ওদের কে একই স্কুল বা কলেজ এ দেয়া তেই থেমে থাকেনি। অনেক ছোটবেলা তেই সমীর বাবু তার বন্ধুর কাছ থেকে কথা চেয়েছিলেন, যে বড় হয়ে তার মেয়ের সাথেই জেনো অভিক এর বিয়ে হয়। যেহেতু ছোটবেলা থেকে অনু নিজর মা কে তেমন ভাবে পায়নি, মালা দেবীর কাছেই সে মায়ের স্নেহো ভালবাসা তে বড় হয়ছে। তাই একে অন্যের বাড়ি যাওয়া, সেখানে থাকা তো লেগেই থাকত। বরং তার জন্যই সমীর বাবু মন দিয়ে ব্যাবসাটা করতে পেরেছিল অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে। 

এখন ব্যপার টা একটু অন্যরকম।  অভিক আর অনন্যা আর বন্ধুত্বটা কি শুধুই বন্ধুত্বেই থেমে আছে?  

অভিক যথেষ্ঠ পরিপক্ক , সংবেদনশীল আর জিবনে কিছু করার ইচ্ছে আছে। কিন্তু অনুর ইচ্ছে গুলো একটু অন্য রকম। এই জেমন ‘ওয়েক উপ সিড’ সিনেমা তে, আইশা। আইশা ব্যানার্জি ছিলো ওর প্রতিমা চরিত্র। হ্যাঁ , অনু ও লেখক হতে চেয়েছিলো। মুম্বাই শহরে গিয়ে লেখালেখি নিয়ে পড়াশুনো করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা বয়স কম এর দোহাই দিয়ে মুম্বাই জাওয়ার দিন গুলো পিছিয়ে দিতে থাকে। তাই একেবারে গ্রাডুয়েশন শেষ করেই কোলকাতার বাইরে পা রাখবার কথা চলছে। অভিক আর অনুর কলেজ জীবনের এটাই শেষ বছর। 

Pexels

আজকের দিনটা অনুর জন্যে খুব বিশেষ, আজকে অভিক এর জন্মদিন।

সকাল সকাল কলেজে এসে অভিক এর মাথায় একটা চাঁটি মেরে বললো “কিরে, আজকের কি প্ল্যান?”। জবাবে অভিক বলে, "কি আর নাতুন প্ল্যান হবে, রাজু দার দোকানে বসে চা এর আড্ডা টা কিন্তু মিস করতে পারছিনা! যা হবে ওটার পরে"। 

"ছিঃ ভাই, নিজের জন্মদিনে কোনো বিশেষ প্ল্যান না করে তুই রাজুদার দোকানে বসে চা এর আড্ডা দিবি? আমার বন্ধু হয় তোর এই কথা টা বলতে একবরো বাঁধলো না?"  অনু একটু মজা করেই বললো। 

"তাহলে তুই বল কি করবো?" অভীক প্রশ্ন করলো । 

"ঠিক সময় হলেই জানতে পারবি। আমাকে আর বলতে হবে না। আমি যাই এখন, ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর হ্যাঁ, বিকেল পাঁচটার সোময় আমাদের স্পেশাল যায়গাতে চলে আসবি, দেরী যাতে না হয়!!!"

অনু তাড়াতাড়ি করে বলে ক্লাসের জন্য বেরিয়ে গেলো। আশোলে তো ক্লাস নয়, ওই স্পেশাল যায়গা টা কে সাজাতে তো সময় লাগবে, তাই তারাহুড়ো কোরে বেরিয়ে গেলো।

এতক্ষণ অবধি মনে হচ্ছিল যে ওরা শুধু বন্ধু, কিন্তু অনুর জন্যে, অভিক অনেক আগেই বন্ধুত্বের শিমারেখা পার করে ফেলেছিল। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। অনু আজকেই অভিককে নিজের মনের কথাটা জানাবে। একদিকে সে খুবই উত্তেজিত, যদি অভিকের মনেও একই অনুভূতি থাকে, কিন্তু অন্য দিকে ভয়েও আছে, যদি অভিকের তার প্রতি শুধু বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই না থাকে, তাহলে তাদের এই এত বছরের সম্পর্কটাও শেষ হয়ে যাবে। এত কিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ যায় ঘড়ির দিকে, পাঁচটা বাজতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। সবরকম অনুভুতি নিয়েই সে জোর কদমে লেগে পড়ল সাজানোতে।

শেষ বেলুন টা ফোলাতেই পেছন থেকে আওয়াজ এলো, "আজকেও দেরী? ডেকোরেশন যখন করবি, সারপ্রাইস ই যখন দিবি তো একটু তাড়াতাড়ি করতে হতো। দেখ! আমি কত সময়নিষ্ট । ঠিক সময় এসে গেছি।” 

“উফ, সময়নিষ্ট বলে এত তাড়াতাড়ি ও কেউ আসতে বলেনি”।

অভিক মনে মনে হেঁসে ভাবে, “হুম! তুই আর পাল্টালিনা।” “হ্যাঁ, সব পার্ফেক্ট । নেহ এবার চোখটা বন্ধ করত দেখি, নাহলে সারপ্রাইস এর মজাটাই তো পাবি না।” “উফ, আবার চোখ বন্ধ কেনো, এমনি যাই না!” অনু নিজের হাথ দিয়ে আভিকের চোখটা ঢেকে আস্তে আস্তে ওর সারপ্রাইস এর দিকে নিয়ে যায়। অভিকেরে চোখ থেকে অনুর হাথটা সরাতেই অবাক হয়ে গেলো অভিক। 

কি এমন দেখে সে এতটা চমকে গেলো? 

অনন্যা কি সত্যি আজকে নিজের মনে কথা অভিক কে বলতে পারবে?