চিরসখা

    A Short Bengali story

by

Rishita Ghosh 

Pexels

গল্পটা কিন্তু আজকের নয়। প্রায় তিনটে বছর হয় গালো, ওদের দেখাও হয়নি, কথা হয়নি আর কোন রকম কোন যোগযোগ ও নেই। ওথছ, কিছু বছর আগে অব্দি ও তারা একে ওপরকে ছারা থাকতেই পারতোনা। সময়, মানুষ কে অনেক কিছু বুঝতে শেখায়, মানুষ চিন্তে শেখায়, পরিস্থিতি ওনুজাই আচরন করতে শেখায়, কিন্তু আবার এই সময় ই মানুষকে তার জীবনের সব থেকে বড় ধাক্কা টা দেয়। অভিক আর অনন্যার গল্প টাও ওনেকটা সময়ের চাকায় বাধা।

 অভিক, উচ্চাকাঙ্ক্ষা না , তবে জীবনে যে একবরেই কিছু করার ইচ্ছা নেই, তেমন টাও না। তার স্বপ্ন গুলো খুব সীমাবদ্ধ। একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী বড়িতে যা হয় আরকি। বাবা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, বিনয় সেন। আর মা এখনো অবধি একটি কলেজ এ পড়ায়, তোবে যত দিন যাচ্ছে তার ও অবসরপ্রাপ্তির দিন আগিয়ে আসছে। বিনয় বাবু আর মালা দেবীর কুল তিনটি সন্তান, দুই ছেলে আর একটি মেয়ে : অভীক, অরূপ আর অপর্ণা। মেয়ে হলো একেবারে বাবার চোখের মণি, আর যত শাসন সব দুই ছেলের ওপর দিয়ে যায়। ছেলেদের জন্য বিনয় বাবু একজন অত্যন্ত কঠোর বাবা।

আবার উল্টো দিকে অনন্যা, একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী বাড়ি থেকে অন্তর্গত না করলেও, ওদের পরিবারকে দেখে বোঝাই যায়না যে ওরা যথেষ্ঠ বড়লোক। অনন্যার বাবা খুব নামি একজন ব্যবসায়ী, সমীর রায়। অনন্যা, বাবার একমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে অনেক আদরে আল্লাদেই ছোটো থেকে বড়ো হয়ছে। মেয়ে যা বলে, বাবা তাই এনে দেন। হ্যাঁ, তার মানে এই নয় যে অন্যায় আবদার গুলো ও মেনে নেন। যেখানে ভুল, সেখানে ঠিকই সে তার মেয়েকে বোকে শাসন করে আবার ঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন । অনন্যার যখন দশ বছর বয়স, তখন তাঁর মা, শ্রীপ্রণা রায়, একটি ব্রেইন টিউমার এ মারা জান। অনেকটাই ছোট হওয়ার কারণে, অনন্যার তার মায়ের স্মৃতি তেমন কিছুই মনেও নেই।

এইবার আসি অভিক আর অনন্যার কথায়। আসলে অনু আর অভিকের বাবা ছোটবেলা থেকেই একই সাথে বড় হয়েছে, একই স্কুল, একই পাড়া। সেই মতে, পারিবারিক বন্ধু হিশেবে ওরাও বন্ধু, কিন্তু ছোট বেলাতেই সমীর বাবু আর বিনয় বাবু চেয়েছিলেন জে তাদের ছেলেমেয়েরা ও তদের মত একসাথে বড়ো হোক। তাই দুজন কেই প্ল্যান করে একই স্কুলে এবং একই কলেজে পড়ান। কলেজে ডিপার্টমেন্ট আলদা হলেও, বিকেলে রাজু দার দোকানে বসে চা এর আড্ডা টা কিন্তু বাধ্যতামূলক, সে যতই ক্লাস আর এসাইনমেন্ট থাকুক না কেনো।  স্কুল জীবনে অভিক আর অনন্যা বেস্ট ফ্রেন্ডস ছিল, কলেজে ওঠার পড়েও তাই আছে। যত দিন গেছে, ওদের বন্ধুত্ব বেড়েছে বই কমেনি। কিন্তু, ওদের বাবারা শুধু ওদের কে একই স্কুল বা কলেজ এ দেয়া তেই থেমে থাকেনি। অনেক ছোটবেলা তেই সমীর বাবু তার বন্ধুর কাছ থেকে কথা চেয়েছিলেন, যে বড় হয়ে তার মেয়ের সাথেই জেনো অভিক এর বিয়ে হয়। যেহেতু ছোটবেলা থেকে অনু নিজর মা কে তেমন ভাবে পায়নি, মালা দেবীর কাছেই সে মায়ের স্নেহো ভালবাসা তে বড় হয়ছে। তাই একে অন্যের বাড়ি যাওয়া, সেখানে থাকা তো লেগেই থাকত। বরং তার জন্যই সমীর বাবু মন দিয়ে ব্যাবসাটা করতে পেরেছিল অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে। 

এখন ব্যপার টা একটু অন্যরকম।  অভিক আর অনন্যা আর বন্ধুত্বটা কি শুধুই বন্ধুত্বেই থেমে আছে?  

অভিক যথেষ্ঠ পরিপক্ক , সংবেদনশীল আর জিবনে কিছু করার ইচ্ছে আছে। কিন্তু অনুর ইচ্ছে গুলো একটু অন্য রকম। এই জেমন ‘ওয়েক উপ সিড’ সিনেমা তে, আইশা। আইশা ব্যানার্জি ছিলো ওর প্রতিমা চরিত্র। হ্যাঁ , অনু ও লেখক হতে চেয়েছিলো। মুম্বাই শহরে গিয়ে লেখালেখি নিয়ে পড়াশুনো করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা বয়স কম এর দোহাই দিয়ে মুম্বাই জাওয়ার দিন গুলো পিছিয়ে দিতে থাকে। তাই একেবারে গ্রাডুয়েশন শেষ করেই কোলকাতার বাইরে পা রাখবার কথা চলছে। অভিক আর অনুর কলেজ জীবনের এটাই শেষ বছর। 

Pexels

আজকের দিনটা অনুর জন্যে খুব বিশেষ, আজকে অভিক এর জন্মদিন।

সকাল সকাল কলেজে এসে অভিক এর মাথায় একটা চাঁটি মেরে বললো “কিরে, আজকের কি প্ল্যান?”। জবাবে অভিক বলে, "কি আর নাতুন প্ল্যান হবে, রাজু দার দোকানে বসে চা এর আড্ডা টা কিন্তু মিস করতে পারছিনা! যা হবে ওটার পরে"। 

"ছিঃ ভাই, নিজের জন্মদিনে কোনো বিশেষ প্ল্যান না করে তুই রাজুদার দোকানে বসে চা এর আড্ডা দিবি? আমার বন্ধু হয় তোর এই কথা টা বলতে একবরো বাঁধলো না?"  অনু একটু মজা করেই বললো। 

"তাহলে তুই বল কি করবো?" অভীক প্রশ্ন করলো । 

"ঠিক সময় হলেই জানতে পারবি। আমাকে আর বলতে হবে না। আমি যাই এখন, ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর হ্যাঁ, বিকেল পাঁচটার সোময় আমাদের স্পেশাল যায়গাতে চলে আসবি, দেরী যাতে না হয়!!!"

অনু তাড়াতাড়ি করে বলে ক্লাসের জন্য বেরিয়ে গেলো। আশোলে তো ক্লাস নয়, ওই স্পেশাল যায়গা টা কে সাজাতে তো সময় লাগবে, তাই তারাহুড়ো কোরে বেরিয়ে গেলো।

এতক্ষণ অবধি মনে হচ্ছিল যে ওরা শুধু বন্ধু, কিন্তু অনুর জন্যে, অভিক অনেক আগেই বন্ধুত্বের শিমারেখা পার করে ফেলেছিল। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। অনু আজকেই অভিককে নিজের মনের কথাটা জানাবে। একদিকে সে খুবই উত্তেজিত, যদি অভিকের মনেও একই অনুভূতি থাকে, কিন্তু অন্য দিকে ভয়েও আছে, যদি অভিকের তার প্রতি শুধু বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই না থাকে, তাহলে তাদের এই এত বছরের সম্পর্কটাও শেষ হয়ে যাবে। এত কিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ যায় ঘড়ির দিকে, পাঁচটা বাজতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। সবরকম অনুভুতি নিয়েই সে জোর কদমে লেগে পড়ল সাজানোতে।

শেষ বেলুন টা ফোলাতেই পেছন থেকে আওয়াজ এলো, "আজকেও দেরী? ডেকোরেশন যখন করবি, সারপ্রাইস ই যখন দিবি তো একটু তাড়াতাড়ি করতে হতো। দেখ! আমি কত সময়নিষ্ট । ঠিক সময় এসে গেছি।” 

“উফ, সময়নিষ্ট বলে এত তাড়াতাড়ি ও কেউ আসতে বলেনি”।

অভিক মনে মনে হেঁসে ভাবে, “হুম! তুই আর পাল্টালিনা।” “হ্যাঁ, সব পার্ফেক্ট । নেহ এবার চোখটা বন্ধ করত দেখি, নাহলে সারপ্রাইস এর মজাটাই তো পাবি না।” “উফ, আবার চোখ বন্ধ কেনো, এমনি যাই না!” অনু নিজের হাথ দিয়ে আভিকের চোখটা ঢেকে আস্তে আস্তে ওর সারপ্রাইস এর দিকে নিয়ে যায়। অভিকেরে চোখ থেকে অনুর হাথটা সরাতেই অবাক হয়ে গেলো অভিক। 

কি এমন দেখে সে এতটা চমকে গেলো? 

অনন্যা কি সত্যি আজকে নিজের মনে কথা অভিক কে বলতে পারবে?




No comments:

Post a Comment