আমার দুর্গা

A Bengali short story

Sohini Bhattacharya

B.A Sem I

Maa is coming
Pic Credit: S.B

সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে আমাদের ঋত্বিক।ঠিক বাকিদের মতনই ঋত্বিক কম্পিটিটিভপরীক্ষা গুলোর  জালে আটকা পরে গেছে,আড্ডার সময়গুলোর মেয়াদ কমেছে। মাঝে মাঝে বিধ্বস্ত বোধ করলেও চোখে অসীম স্বপ্নগুলো ওর জীবনের সমস্ত গ্লানি কাটিয়ে দেয়।মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরের ব্রাহ্মণ ছেলে, দিল্লীতে গীয়ে নিজের ব্যাচেলর্স করার ইচ্ছেটা ছোটো থেকেই। বাবা-মার একমাত্র ছেলে হওয়া বেশ আদর এবং যত্নেই ওর বড়ো হয়ে ওঠা।ছেলের বাইরে গিয়ে পড়া নীয়ে ঋত্বিকের বাবা, কৌস্তববাবুর সমস্যা না থাকলেও মা অনন্যা দেবীর ঘোড় আপত্তি । ছেলের দেখাশোনা কে করবে?এই প্রশ্ন ওনার দিন রাতের ঘুম কেড়েছে।

অনন্যা দেবী – “বাবু সবকিছু নিয়েছিস তো? একটু খাবার নিয়ে নিচ্ছি,যেতে যেতে খেয়ে নিবি “

ঋত্বিক – “সময়টা কখন পাবো ? পড়তে পড়তে যাবো তো , খাবো কখন?বলো”

অনন্যা দেবী – “বেশী কথা বাড়িও না তুমি, অতটা বড়ো হয়ে যাসনি, নিয়ে যাচ্ছি খেয়ে নিবি”

সাইন্স নিয়ে পড়ায় ইঞ্জনিয়ারিংটা বরাবরের লক্ষ্য ঋত্বিকের, আজ ওর 'JEE MAINS”এর দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষা। ছেলের থেকে মায়ের টেনশন যে বেশী তা হলের বাইরের দৃশ্য বলে দিচ্ছে।

অনন্যা দেবী-“ সবটা মনে আছে তো? আমি জানি তুই পারবি”

ঋত্বিক –হ্যা মা, চেষ্টা করবো,তুমি চিন্তা করো না”

সমস্ত খুঁটিনাটি ঝগড়ার মাঝেও ঋত্বিক যানে মায়ের থেকে “WORDS OF AFFIRMATION'' টা না পেলে ওর কোনো কাজ ঠিকঠাক হয়ে না ।

অনন্যা দেবী – ''খুব ভালো হবে,আমি বাইরেই থাকবো ''

 

এক্সাম দিয়ে আসার পর কেটেছে ১০-১৫ দিন, হালকা  বিবাদ, মনোমালিন্য ছেলে এবং মায়ের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গেছে।

এইসবের মাঝে এসে গেলো ঋত্বিকের জীবনের সবথেকে বড়ো দিন,ওর 'JEE' র মার্কস বেরোনোর দিন।গোটা পরিবার সকাল থেকে নিস্তভতা পালন করা পছন্দ করছিলো। দুপুর ১২ টার ঘন্টাটা পড়তেই ঋত্বিকের হাত দুটো যেন কম্পিউটারের কিবোর্ড সঙ্গে আটকে যাচ্ছিলো। কোনোরকমে জড়তা সরিয়ে নিজের রেজাল্ট দেখলো ঋত্বিক, কম্পিউটার ঘর থেকে জোরে একটা চিৎকার পৌছালো অনন্যা দেবী অব্দি-

'মা ও মা!!!'

ঋত্বিকের কণ্ঠস্বরে বুক কেঁপে উঠলো ওনার, হঠাৎ ছেলের হাতের ছোয়া অনুভব করলেন।

গলা জড়িয়ে মাকে নন্দস্বরে ঋত্বিক জানালো ওর রেজাল্ট শুধু যে-সে রেজাল্ট নয়, একেবারে IIT- তে পৌঁছে দিয়েছে।চোখের কোনে জল আটকে রেখে ছেলেকে আদর করে বললেন

'আমি তো জানতাম তুই পারবি'

ঋত্বিক - ''থ্যাংক ইউ মা, তুমি পাশে না থাকলে হতোনা '

অনন্যা দেবী - ''ঢং না করে যাও গিয়ে বাবাকে জানাও, আজকে রাতে মাংস আর ভাত ''

ঋত্বিক - ''জমে গেছে, জমে গেছে!!!!''

হাসি, আনন্দে এক-এক দিন এগোতে থাকলো সঙ্গে ঋত্বিকের যাওয়ার ঘন্টাও এগোচ্ছে।অদ্ভুতভাবে রেজাল্ট বেরোনোর পর থেকে একদিনও অনন্যাদেবী ঋত্বিককে যাওয়া নিয়ে কোনোপ্রকার বাধা, অসুবিধা প্রকাশ করেননি, হয়তো যাওয়ার আগে তিনি বাড়ির পরিবেশ ঠাট্টা, ইয়ার্কির মধ্যেই সীমিত রাখতে চাইছিলেন।

অনন্যা দেবী - ''এই রংটা বেশ ভালো লাগবে তোর উপর বাবু জানিস! ''

ঋত্বিকে - ''ও বাবা, মাকে বোঝাও না এই লাল রঙের জামাটা পড়লে কলেজে আমার মান থাকবেনা আর ''

কৌস্তববাবু - ''হ্যা হ্যা, ঠিকই তো, তাছাড়া কলেজ তো শুধু আর 'all boys' কলেজ না ''

ঋত্বিক - ''সেটাই তো, মা বুঝছেনা দেখো ''

অনন্যা দেবী - ''খুব পেকেছিস!!!!মনে আছে বাবু, ছোটবেলায় এই পুজোর আগে তুই জেদ ধরতিস 'cap' ফাটাবি বলে, বাবা একসাথে ১০ টা এনে রেখে দিতো '

ঋত্বিক - ''আর আমি গোটা পুজো পাড়ায় বসে 'cap' ফাটিয়ে কাটিয়ে দিতাম ''

অনন্যা দেবী - ''কত বড়ো হয়ে গেলি, এতটাই যে এই বছর হয়তো পুজোয় থাকবি না ''

ঋত্বিক - ''তুমি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে মা?''

প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি অনন্যা দেবী।

 

Maa Durga decking up at Kumortuli
Pic Credit: S.B

চোখের পলকে কেটে গেলো ৩ সপ্তাহ, ঋত্বিকের যাওয়র দিনটা এলো। মুখে আলগা হাসি নিয়ে নিজেকে যেন শক্ত করে ধরে রেখেছেন অনন্যা দেবী।

ঘড়িতে ৩টে বাজলো সঙ্গে ঋত্বিকের বাড়ি ছাড়ার ঘন্টা পরে গেলো

কৌস্তববাবু - ''সমস্ত ডকুমেন্টস, ব্যাগটা আবার একবার দেখে নাও ভালো করে ''

ঋত্বিকে - ''হ্যা বাবা, মা সব গুছিয়ে দিয়েছে ''

লুচি-আলুরদমের টিফিন বক্সটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে অনন্যা দেবী বলে উঠলেন

''এবার থেকে মা না এবার থেকে একা-একাই সবটা করতে হবে!''

কথাটা যেন বুকে তীরের মতন আঘাত করলো ঋত্বিকের।

যেখানে লুকিয়ে আছে ছোট থেকে বড়ো হয়ে ওঠার গল্প, লুকিয়ে আছে মায়ের বকুনি, বাবার পাশে থাকা, যেখানে কাঁদলে মায়ের কোলে মাথা রাখার সুযোগ, বিকেলে বসে বাবার সাথে ক্রিকেট দেখা,সবটা তাকে ছাড়তে হবে, পা দিতে হবে একটা সম্পূর্ণ অচেনা পথের দিকে। নেই গুলোর হিসেব দূরে ঠেলে, মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে মাকে জাপ্টে ধরে আদর করলো ঋত্বিক।

অনন্যা দেবী - ''সাবধানে থাকবে, ঠিক করে খাবে, আর রোজ রাতে ফোন করবি আমাকে, নয়তো ঐখানে গিয়ে পিটিয়ে আসবো ''

ঋত্বিক - ''হ্যা মা, তুমি বাবা দুজনেই ওষুধ ঠিক করে খাবে, আর ঝগড়া করবেনা কিন্তু!!!!''

কৌস্তববাবু - ''হোলো তোমাদের, আর কিন্তু সময় নেই ''

অনন্যা দেবী - ''যা বেরিয়ে পর, আর শোন্, পুজোতে আসতে পারবি কি?''

প্রশ্নটার মিথ্যে জবাব দিতে চায়নি ঋত্বিক, তাই ভারী গলায়, কান্নাটাকে লুকিয়ে বললো

''হয়তো না!!!''

 

কেটেছে দুটো মাস, মহালয়া পেরিয়ে আজ মহাষ্টমী।হঠাৎ ভোর ৫-টায় কলিংবেলের আওয়াজটায় ঘুম ভেঙে যায় অনন্যা দেবীর

অনন্যা দেবী - ''কিগো??? এতো ভোর বেলা তুমি কাউকে ডেকেছো নাকি?? অঞ্জলি তো ৮ টায় ''

কৌস্তবাবাবু - ''আমি কেন ডাকতে যাবো, গিয়ে দেখো কে এলো আবার, আমাকে ঘুমাতে দাও ''

অনন্যা দেবী খানিকটা বিচলিত হয়েই ওপর থেকে নিচে নামলেন দরজাটা খুলে দেখতে।দরজা খুলতেই তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, ঠান্ডা বাতাস এবং শঙ্খধ্বনির আওয়াজ মনে হোলো যেন কোনো দূরদেশ থেকে ভেসে এসে ওনাকে ঠেলা দিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যে মনেহলো সামনে যা দেখছেন হয়তো তা স্বপ্ন আর বাস্তবটা হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা।

 

ঋত্বিক - ''শুভ দূর্গাপুজো আমার দুর্গাকে ''

কণ্ঠস্বর শুনে অনন্যা দেবীর ঘোর কাটলো।২ মাসের জমানো কান্নাটা যেন ছেলেকে আখরে ধরে ভেঙে পড়লো, মায়ের হাতের ছোঁয়ায় ঋত্বিকও যেন সমস্ত ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেলো।

কৌস্তববাবু - ''আরে,ছেলে এখানে যে?? কিভাবে???''

অনন্যা দেবী - ''ওর টিকিটের ব্যবস্থা কে করেছে তা আমি ভালো করেই জানি মিস্টার বক্সী ''

No comments:

Post a Comment