Moumita De Das
Associate Professor and Editor (ASCOPE)
সকাল ৮.১০ এর বনগাঁ লোকাল।সোমবারের শিয়ালদাহ স্টেশন এর চত্বর -মেহুলি কোন মতে দৌড়ে ট্রেনটি ধরল - লেডিস কম্পার্টমেন্ট।খুব কষ্ট করে একটা সিট এ গাদাগাদি করে নিজেকে ঠেকালো, কারণ, অনেকটা পথ তাকে যেতে হবে.- অশোকনগর স্টেশন। যেখানে সে একটি সরকারি স্কুলের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিকা।এই রোজনামচার জীবনে বনগাঁ লোকাল এর লেডিস কম্পার্টমেন্ট, মেহুলির জীবনে একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এখানে রোজ কত-শত নারীরা জীবন যাত্রায়, তাদের দৈনন্দিন জীবনের লড়াই এ সামিল হন - কিছুজনস্বেচ্ছায়, কিছুজন পরিস্থিতির চাপে।আজ পঞ্চমী - দূর্গা পুজোর পঞ্চম দিন, আজ মেহুলির স্কুলে অনুষ্ঠান হয়ে পুজোর ছুটি পরবে।মেহুলি ভাবে, মা প্রত্যেক বছর আসেন - আর এই কয়েকদিন, বাংলা এবং বাঙালি মানুষেরা, তাঁরা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে থাকুন না কেন - জাত-পাত, ধর্ম - সব রকম বিভেদ ভুলে দুর্গাপুজোর উন্মাদনায় মেতে ওঠেন।মূলতঃ পশ্চিমবঙ্গে, ছোট-বড় শহর ও শহরতলির কত-শত জীবন্ত দূর্গা আছেন - যারা প্রতিনিয়ত তাঁদের মতন করে জীবন-যুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন, তাঁদের গল্প কি আমরা কখনও জানতে চাই?না, জানতে পারি ?কিন্তু, লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রী হওয়াতে, মেহুলি, অনেক জীবন যুদ্ধের সাক্ষ্য বহন করেছে, যেটি সে নিজের জীবনের একটি সম্পদ বলে মনে করে ।এই গল্প তাঁদের মধ্যে থেকেই একটি ছোট্ট মেয়ের লড়াইয়ের। বলতে পারেন, মেহুলির জীবন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ছ - আনা।ট্রেন তখন সবে দমদম junction ঢুকছে- মানুষজনের ভিড়ের মধ্যে থেকে দূরের কপের্টমেন্ট থেকে একটি সুরেলা কণ্ঠ ভেশে এলো -'নদী ভরা ঢেউ বোঝ নাতো কেউ, কেন তরী নিজে বাও বাও বাও রে...ভরসা করি এ ভব কান্ডারী, হালটি ছাড়িয়া তারে দাও দাও দাও রে...'চমকে গেলো মেহুলি , এ তো ভবা পাগলা র গান - সে শান্তিনিকেতনে লক্ষণ দাস বাউলের কণ্ঠে শুনেছে - খুব সুরেলা কণ্ঠ - ওর মন ছুঁয়ে গেল - ট্রেন ছুটতে থাকল - ও অস্থির হয়ে উঠল - গায়ক কে দেখার জন্য...ট্রেন যখন বারাসাত ঢুকছে তখন সে দেখল - একটি জীর্ণ-শীর্ণকায় হাফ প্যান্ট পড়া ছেলে গাইছে। ও তখন গান ধরেছে -'মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে...আমার মনের মানুষের সনে...'মেহুলি ওকে কাছে ডাকল, "এই শোন, এদিকে এস, কি নাম তোমার?"ও একগাল হেঁসে বলল, "জয়া। "আঁৎকে উঠল মেহুলি, বলল ,"সে তো মেয়েদের নাম, জানিস, 'জয়া' দূর্গার আরেকটি নাম? তুই তো ছেলে?"জয়া হেঁসে বলল, "না, আমি তো মেয়ে -"মেহুলি বলল, "কিন্তু, তুই ছেলে সেজে কেন গান গাইছিস?"জয়া - "দিদি, সমাজের চোখ কে ফাঁকি দিতে, যাতে মানুষ নামের শেয়াল - কুকুরদের হাত থেকে বাঁচতে পারি।"মেহুলি ওঁর কথা শুনে মনে হল - সমাজের গালে জয়া একটি সপাটে চড় কষিয়েছে।মেহুলি - "তোমার বাড়িতে কেউ আছে?"জয়া - "হ্যাঁ দিদি, আমার ক্যান্সার আক্রান্ত মা , আর কেউ নেই। আমি সকাল ৮ থেকে ১১ অবধি ট্রেনে লেডিস কম্পার্টমেন্ট এ গান গাই। আমার বাড়ি বিরাটি। পৌঁছে, মা র জন্যে রান্না করি, তারপর আবার ৪ থেকে ৭ অবধি গান গাই ট্রেনে, কিন্তু তখন বেশি দূর যাইনা।মেহুলি ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা বের করে ওকে হাতে দিলো।জয়া - "কি করছ দিদি - আমার কাছে খুচরো নেই, তুমি অত বড় নোট দিও না। "মেহুলি অবাক হল, চোখ ছলছল হয়ে উঠল, আর বলল, "আজ পঞ্চমী জানত? জয়া কিন্তু দূর্গা মায়ের আরেকটি নাম - ধরে নাও না, আমি মা দুর্গার পূজার পুষ্পাঞ্জলী দিচ্ছি। "Announcement হল, পরের স্টেশন, অশোকনগর।মেহুলি উঠে দাঁড়াতেই --জয়া ওকে ঢিপ করে প্রণাম করল।আর ছলছল চোখে বলল, " জয় মা দূর্গার জয়। "মেহুলী ওর মাথায় হাত রাখল আর আলতো করে ওর চিবুকে হাত দিয়ে বলল, "জয় হোক মা জয়ার জয়।"ট্রেন অশোকনগর স্টেশন ছেড়ে ধীর গতিতে এগিয়ে চলল।

No comments:
Post a Comment